রায়হান সিদ্দিক: অতিমারি করোনাভাইরাসের কারণে দুই বছর পর প্রাণের উৎসব পহেলা উদযাপনে অংশ নেবে যশোরবাসী। এ বছর ফের ঢাক-ঢোলের তালে তালে মাতবে সব বয়সী মানুষ। তবে রমজানের কারণে এবার স্বল্প পরিসরে কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবেই দুপুর দুইটার মধ্যে সকল অনুষ্ঠান শেষ করতে বলা হয়েছে। এরপরও যশোরে সাংস্কৃতিক অঙ্গণে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। সরগরম সংস্কৃতির রাজধানী খ্যাত যশোর।
বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাঙালির প্রাচীনতম ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখ নতুনকে গ্রহণ করার, আর পুরনোকে মুছে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা গ্রহণ করার উৎসব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশে এই নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে সার্বজনীন উৎসবে। আবহমানকাল ধরে বাংলার ঘরে ঘরে পালিত হয় বর্ষবরণের উৎসব।
স্বল্প আয়োজনের মধ্যেও এবার পহেলা বৈশাখ ফিরছে সেই চিরচেনা রূপে। তবে করোনার চোখ রাঙানি না থাকলেও রমজানের কারণে অনেকেই অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। সেই ধোঁয়াশাও কেটে যায় গত ৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার। এদিন কালেক্টরেট সভাকক্ষে জেলা প্রশাসন আয়োজিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন প্রস্তুতিসভায় সিদ্ধান্ত হয় গণমানুষের প্রাণের অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখ সীমিত পরিসরে হলেও আয়োজন করা হচ্ছে। থাকবে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রাও। তারপর থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। দীর্ঘদিনপর বৈশাখ উদযাপন প্রস্তুতিতে তাই এখন ব্যস্ত পার করছে যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
‘সংস্কৃতির রাজধানী’ যশোর শহর থেকেই প্রথম শুরু হয় বৈশাখের প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। যার ধারাবাহিকতা আজও বজায় রয়েছে। এবছরও মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে থাকছে সংগঠনগুলোর নানা আয়োজন। অন্যদিকে বৈশাখের দাওয়াতপত্রে ফুটে ওঠে বাঙ্গালী ঐতিহ্য বা গ্রাম বাংলার চিত্র। যা এবছর খুব একটা চোখে পড়বে না।
গত ৪৮ বছর ধরে যশোরের পৌর উদ্যানে প্রভাতে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে উদীচী জেলা সংসদ। পরিবার-পরিজন নিয়ে নতুন পোশাকে, নতুন সাজে সেই আয়োজনে সামিল হন হাজারো মানুষ। এবছরও সেই আয়োজন থাকছে বলে জানান সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উপ পরিষদদের আহ্বায়ক কাজী শাহেদ নেওয়াজ।
তিনি আরও জানান, করোনার কারণে দীর্ঘ দু’বছর বৈশাখ উদযাপন না করতে পারার বেদনা থেকে এবার কিছুটা হলেও মুক্তি মিলছে। তাই স্বল্প পরিসর হলেও সাড়ম্বরে বৈশাখ উদযাপন হবে। উদীচী জেলা সংসদ এবছর ৭টা ১মিনিটে পৌর উদ্যানে বৈশাখী আয়োজন শুরু করবে। সংগঠনের প্রায় ৩০০ শিল্পীর সমন্বয়ে সাড়ে তিন ঘণ্টার আয়োজনে থাকছে পঞ্চ কবির গান, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, আবৃত্তি, নৃত্য তবে সময় সল্পতার কারণে এবছর হচ্ছে না যাত্রাপাল।
চারুপীঠের সাধারণ সম্পাদক কাজী মামুনুর রশিদ জানান, স্বল্প সময়ের ভেতর বৈশাখ পালনের সিদ্ধান্ত হলেও আয়োজনটা বেশ বড় পরিসরেই হচ্ছে। দেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা হয় ১৯৮৫ সালে যশোরে। এই প্রতিষ্ঠানই মঙ্গল শোভাযাত্রার সূতিকাগার। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবছরও বেশ জমাকালো শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। বাঘ, ঘোড়া, হাতি, পাখি, রাজা, রাণীর শত মুখোশ প্রস্তুত করা হয়েছে। রয়েছে বৃহতর তিনটি পুতুল। চারুপীঠ চত্বর থেকে সকাল ৮ টায় প্রায় ২০০ জনের সুসজ্জিত মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে।
বৈশাখের আয়োজন নিয়ে তির্যক যশোরের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর দাস রতন বলেন, পবিত্র রমজান মাসের কারণে সকাল থেকে দুপুরের ভেতরেই বৈশাখের আয়োজন শেষ করার। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তির্যক যশোর সকাল ৭টায় ডাক্তার আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এরপর মঙ্গল শোভাযাত্রা। তিনি আরও জানান, প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও ঐতিহ্য ধরে রাখতে দাওয়াতপত্র তৈরি হয়েছে প্রাচীন জীবন-যাপনের ধারা ঠেলা জাল অনুকূলে।
হাতপাখা, মুখোশ,গরুর গাড়ি, পুতুল বানিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে সাংস্কৃতিক সংগঠন বিবর্তন যশোর। সংগঠনের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল বলেন, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ আমরা দীর্ঘ দু’বছর পর আবার উদযাপন করতে পারছি এটা খুবই আনন্দের বিষয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বৈশাখ পালনের সিদ্ধান্ত হওয়ায় সব সংগঠন গুছিয়ে উঠতে পারেনি। তবুও স্বল্প পরিসরের এবারের আয়োজন বেশ জমাকালো হবে আশা করছি।
মুসলিম একাডেমি মাঠে ৬টা ৩১মিনিটে সমবেত গান, নৃত্য, আবৃত্তি, শ্রুতি নাটকের আয়োজন রয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন পুনশ্চ যশোর। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পান্না লাল দে জানান, ২০০ শিল্পীর পরিবেশনায় থাকবে এই আয়োজন।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মঙ্গল শোভাযাত্রায় এদিন বিশেষ আয়োজন রেখেছে যশোরের নব্য সাংস্কৃতিক সংগঠন থিয়েটার ক্যানভাস। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কামরুল হাসান রিপন জানান, দীর্ঘ দু’বছর একটি ক্ষুধা নিয়ে বসবাস করছি এবার সেই ক্ষুধার ক্ষান্তি হবে। সাড়ম্বরে পালন হবে পহেলা বৈশাখ। থিয়েটার ক্যানভাস বৈশাখী দাওয়াতপত্র তৈরি করেছে শাহী ফরমানের আদলে।
সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি এবছর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদও বৈশাখ উদযাপনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তপন ঘোষ জানান, এবছর মঙ্গল শোভাযাত্রায় পূজা পরিষদের আয়োজনে ট্রাকে করে থাকছে চড়কের দল, জয় ঢাক। শোভাযাত্রা শেষে বেলা ১১টায় হরিসভা মন্দিরে হবে দোলযাত্রা।
এছাড়াও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের আয়োজনে টাউন হল মাঠে সকাল সাড়ে ৭টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবে জোটভূক্ত সংগঠনের পরিবেশনা। এরপর সকাল নয়টায় টাউনহল মাঠ থেকে শুরু হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। যেখানে অংশ নেবে যশোরের সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সুকুমার দাস বলেন, কয়েকটি সংগঠন আলাদা অনুষ্ঠান করলেও সকল সংগঠনের নববর্ষে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে টাউনহল মাঠে দুই ঘন্টার প্রভাতী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। তিনি আশা ব্যক্ত করেন দুই বছর পর শোভাযাত্রা গণমানুষের সরব অংশগ্রহণে হবে পহেলা বৈশাখ মুখরিত ও বর্ণিল।
পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ারদার বলেন, কোন রকম বাধা-বিপত্তি ছাড়ায় সুষ্ঠুভাবে যাতে বাঙালির প্রাণের উৎসব পালন হয় তার জন্য পহেলা বৈশাখের সমগ্র অনুষ্ঠানে থাকবে পুলিশি নিরাপত্তা।
জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন,পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব। রমজানের মধ্যে এ আয়োজনে যেমন রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে; তেমনি সার্বজনীন উৎসবের প্রাণের এ আহ্বানে এক সাথে মিলিতও হতে হবে। তাই পহেলা বৈশাখে সকাল নয়টায় যশোর মুন্সী মেহেরুল্লাহ ময়দান (টাউনহল) থেকে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা।