রাবেয়া ইকবাল, কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি: যশোরের কেশবপুর উপজেলায় সারডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা ইরি-বোরো ধানের আবাদ নিয়ে শংকিত রয়েছে। এ মৌসুমে পটাশ ও ফসফেট সার বেশি দামে বিক্রি করছে বিসিআইসির সার ডিলাররা।
বোরো মৌসুম শুরুর মুহূর্তে সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। অনেক কৃষক চড়া দামে পটাশ ও ফসফেট সার কিনতে না পেরে বোরো ক্ষেতে শুধু ডিএপি (ড্যাপ) সার প্রয়োগ করছেন। কৃষি বিভাগ চড়া দামে সার বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
৫০ কেজির বস্তা প্রতি ফসফেট সরকারি মূল্য ১১০০ টাকা এবং খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ২২টাকা। পটাশ সরকারি প্রতি বস্তা মূল্য ৭৫০ টাকা, খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১৫। সেখানে ডিলার ও সাবডিলাররা পটাশ বিক্রি করছে প্রতি কেজি ২২-২৫ টাকা দরে এবং ফসফেট প্রতিকেজি ৩০-৩৫ টাকা দরে। এ কারণে কৃষকরা ইরি-বোরো আবাদ নিয়ে সংকোচিত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১১ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় এ বছর ইরি-বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার ৪ শত হেক্টর জমিতে। গতবছর লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১৩ হাজার ৮ শত ৩০ হেক্টর জমি। বোরো মৌসুমের শুরুতেই ১৫-২০ দিন ধরে পটাশ ও ফসফেট সারের সংকট চলছে এ উপজেলায়। সার সংকটকে পুঁজি করে এক শ্রেণির খুচরা সার ডিলার ৭৫০ টাকা বস্তা পটাশ সার ১১০০-১২৫০ টাকায় বিক্রি করছে। ফসফেট প্রতিবস্তা সরকারি মূল্য ১১০০ টাকা সেখানে বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ টাকা থেকে ১৭৫০ দরে। উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নে পটাশ ও ফসফেট সার সংকট বেশি।
কৃষি অফিস আরো জানায়, কেশবপুর পৌসভাসহ উপজেলায় ১৩ জন সরকারি ডিলার রয়েছে। সাবডিলার রয়েছে ১১ ইউনিয়নে (পৌরসভাসহ) ১০৮ জন। এ উপজেলায় চলতি মৌসুমে সরকার ডিলারদের মধ্যে সার বরাদ্দ দিয়েছেন জানুয়ারিতে ৩৩০ মেট্রিকটন এবং ফেব্রুয়ারিতে ১২৫ মেট্রিক টন। বরাদ্দ কম থাকায় এ মাসে সারের দাম একটু বেশি। সারের দাম বেশি নেয়ার কথা জানতে চাইলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে জনৈক ডিলার বলেন, এ মাসে আমি বরাদ্দ পেয়েছি ১২ বস্তা। আমরা ক্রয় করছি ন’পাড়া থেকে পটাশ ৯৫০ টাকা দরে আর বিক্রি করছি ১১০০ টাকা দরে। বরাদ্দ কম থাকায় চাহিদা একটু বেশি। আমার ঘরে কয়েকশত বস্তা ইউরিয়া মজুত রয়েছে। কিন্তু সাবডিলাররা তাদের প্রাপ্য সার নিচ্ছে না। তাহলে আমরা এ সার কি করবো এবং আর কোথায় বিক্রি করবো ? ভালুকঘর বাজারের ডিলার আব্দুর সাত্তার জানান, সবধরনের সার আমার কাছে মজুত আছে। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরার করা হচ্ছে।
সাগরাদাঁড়ি গ্রামের কৃষক আফসার আলী জানান, বোরো ক্ষেত তৈরির আগে ফসফেট ৩৫ টাকা ও পটাশ ২২ টাকা দরে কিনেছি এক সাবডিলারদের কাছ থেকে। কৃষক রুস্তম আলি বলেন, সরকারি দরে সার চাইলে বলে, বাজারে সার সংকটের কারণে বাইরে থেকে এনে চড়া দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এমন কি ডিলাররা বলে, আমার কাছে পটাশ বা ফসফেট সার নেই। ভরতভায়না গ্রামের ফারুক বলেন, সার ডিলারের দোকানে গিয়েছিলাম। প্রথমে বলেছে ফসফেট ও পটাশ সার নেই। পরে বলেছে দাম একটু বেশি। বস্তাপ্রতি ৩৫০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা। এ কারণে বেশি টাকা দিয়ে আমি সার কিনিনি। শুধু কালো সার (ডিএপি) দিয়ে বোরো রোপণ করছি। কেশবপুরে অনেক ডিলার সার বিক্রি করছে কিন্তু সার বিক্রির কোন অনুমোদন তাদের কাছে নেই। জনৈক ডিলার বলেন, ‘লাল’ (পটাশ) সার বাজারে নাই তাই দাম বেশি নিয়েছে। সার কেনার পর দোকান থেকে কোনো ভাউচার দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দোকানদার (খুচরা সার ডিলার) কোনো ভাউচার দেন না।’ কাগজপত্র বিহিন অন্য এক সাবডিলার জাহাঙ্গীর আলম জানান, বাইরে থেকে চড়া দামে সার ক্রয় করে আনার কারণে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। এ ছাড়া তিনি বলেন, এক মাস যাবৎ পটাশ ও ফসফেট সারের সংকট চলছে তাই দাম বেশি। অন্য এক ডিলার বলেন, আমরা বিসিআইসির সার ডিলারের কাছে সার চাইলে আজ নয় কাল করে সময় পার করছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঋতুরাজ সরকার চড়া দামে সার বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, কৃষকরা সচেতন হলে ডিলাররা কোনভাবে চড়া দামে সার বিক্রি করতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যপ্ত পরিমাণে সার মজুত আছে। তবে ডিলারদের বেশি দামে সার বিক্রি করার কোন প্রমাণ পেলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দায়িদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।