নিজস্ব প্রতিবেদক: শামসুর রহমান মীর বিয়ে করেননি। ৬৮ বছর বয়সী এই মানুষটি বাড়িতে একাই থাকতেন। কখনো হোটেলে, কখনো রান্না করে খেতেন। তবে সকালের নাশতা তিনি হোটেলেই করতেন। শুক্রবার সকালেও বাড়ির কাছে যশোর-সাতক্ষীরা আঞ্চলিক মহাসড়কের বেগারীতলায় একটি হোটেলে বসে ছোট ভাইয়ের নাতি তৌহিদুল ইসলাম মীর (৩৮) ও তিনি নাশতা খাচ্ছিলেন। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি কাভার্ডভ্যান হোটেলে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই শামসুর ও তৌহিদুলসহ পাঁচ জন প্রাণ হারান।
নিহত অন্যরা হলেন, মণিরামপুর উপজেলার টুনিয়াঘরা গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান (৪৮), তার ছেলে তাওহিদ হাবিব তাওসি (৬) এবং জয়পুর গ্রামের আব্দুল মমিনের জিয়ারুল ইসলাম (৩৫)।
ঘটনাস্থলের পাশেই টুনিয়াঘরা গ্রাম। ওই গ্রামের মীর পাড়ার রফিজ মীরের ছেলে শামসুর রহমান। প্রায় ছয় কাঠা জমিতে সেমিপাকা ঘর তুলে একাই বসবাস করতেন তিনি। এক সময় গ্রামের স্কুলে বদলি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন শামসুর রহমান। পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করে এবং বাড়িতে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
দুর্ঘটনার পর তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে লেবু, লিচু, আম, গাছ, কাঁঠাল, পেয়ারা ও পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের কিছু ছোট-বড় গাছ। অল্প একটু জায়গায় বেগুনের চারা লাগানো। সেগুলো কেবল বড় হচ্ছে। বেগুনের ক্ষেতের চারপাশ নেট দিয়ে ঘেরা। ছোটখাটো জঙ্গল বলা যায়। এরকম জায়গার মধ্যে একটি মাত্র টিনের ঘরে টালির ছাউনি দেওয়া। বাড়িতে কেউ নেই। যিনি থাকতেন তার মৃত্যুতে ছায়াঘেরা বাড়িটি যেন খাঁ খাঁ করছে।
দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়লো, খাটের ওপর কাঁথা-বালিশ, বই ও ছোট একটি আয়নাসহ বেশকিছু জিনিস ছড়িয়ে আছে। ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়েই হয়তো নাশতা করতে চলে গিয়েছিলেন শামসুর রহমান, তাই কিছু গোছানো হয়নি। ঘরের বাইরে দুটি গাছে বাঁধা দড়ির আড়ায় একটি লুঙ্গি, গামছা ও পাঞ্জাবি ঝুলছে। পাশে একটি ছোট কবুতরের ঘর। সেখানে ঘুর ঘুর করছে কয়েকটি কবুতর।
এই বাড়ির পাশেই ছোট্ট একটি ঘর তুলে বসবাস করতেন শামসুর রহমানের ভাতিজার ছেলে তৌহিদুল ইসলাম মীর। দাদা-নাতি দুই জন গিয়েছিলেন বাজারে চা-নাশতা খেতে। কাভার্ডভ্যানের চাপায় দুই জনই মারা গেছেন।
শামসুর রহমানের ছোট ভাই মশিয়ার রহমান মীর বলেন, ‘বেগারীতলার দুর্ঘটনায় সেজো ভাই শামসুর রহমান মীর ও আমাদের নাতি তৌহিদুল ইসলাম মীর মারা গেছে। সেজো ভাই বিয়ে করেননি। তিনি একা আলাদা বাড়িতে থাকতেন। সেখানেই বাচ্চাদের পড়াতেন এবং নিজে রান্না করে খেতেন।’
তৌহিদুল ইসলামের বাড়িতে কেউই ছিলেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, পাশেই তার বাবা মীর আসাদ আলী ওরফে বাবু মীরের বাড়িতে রয়েছেন সবাই। বাবু মীরের বাড়িতেও ভিড় করেছেন প্রতিবেশীরা। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই কাঁদছেন। সেখানে কথা হয় তৌহিদুল ইসলামের বাবা মীর আসাদ আলী ওরফে বাবু মীরের সঙ্গে। দুই ভাইয়ের মধ্যে তৌহিদুল মীর বড়।
বাবু মীরেরও বেগারীতলা বাজারে একটি চায়ের দোকান রয়েছে। তৌহিদুল ইসলাম দিনমজুর। বাঁশের হাটে কাজ করেন। তার চার ছেলে মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে হাবিবার বিয়ে হয়ে গেছে। মেজো মেয়ে সোহানা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ছেলে শাওনের বয়স ছয় বছর এবং ছোট মেয়ে মনির বয়স ৬ মাস।