প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মৃতিচারণ
এহসান-উদ-দৌলা মিথুন
আজ বরেণ্য সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৫ সালের এই দিনে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। একটি বছর কেটে গেছে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠের দৃঢ়তা, কলমের সাহস, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা আজও যশোরের সাংবাদিকতা অঙ্গনে গভীরভাবে অনুভূত হয়।
তিনি ছিলেন আমার ছোটচাচা। তাই তাঁর চলে যাওয়া আমার কাছে কেবল একজন গুণী সাংবাদিকের প্রয়াণ নয়; একজন অভিভাবক, একজন শিক্ষক এবং আমাদের পরিবারের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে রুকুনউদ্দৌলাহকে মূল্যায়ন করলে স্পষ্ট হয়-তিনি ছিলেন একটি সময়ের সাক্ষী, একটি আদর্শের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকতার এক স্বতন্ত্র বিদ্যালয়।
রুকুনউদ্দৌলাহ আপাদমস্তক সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কেবল জীবিকা ছিল না; ছিল সত্য অনুসন্ধান, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক কঠিন ব্রত।
তিনি দেশপ্রেমের কথা বলেছেন, স্বাধীনতার কথা বলেছেন, মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার কথা বলেছেন। নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা বললেও কখনো সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নেননি। বরং সব সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার, সমান সুযোগ এবং ন্যায্য প্রাপ্তিকে তিনি একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত হিসেবে দেখেছেন।
পিছিয়ে পড়া মানুষকে এগিয়ে নেওয়া, অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা-এসব ছিল তাঁর সাংবাদিকতার অন্তর্নিহিত দর্শন। সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল ইতিবাচক ও মানবিক; কোনো বিভাজন সৃষ্টির জন্য নয়, বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য।
সর্বোপরি, তিনি মানুষের মুক্তিকে দেখেছেন এক ধরনের সাধনা হিসেবে। সাংবাদিকের সামাজিক দায় ও দায়িত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ হিসেবে।
রুকুনউদ্দৌলাহর কলমে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। ছিল সরলতা, যুক্তি, সাহস এবং বাস্তবতার নির্মোহ প্রতিফলন। সমাজের অসংগতি, মাটি ও মানুষ, গ্রামবাংলার জীবন, মানুষের দুঃখ-বঞ্চনা এবং শেকড়ের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক তাঁর লেখাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বাধার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কোনো চাপ, ভয় কিংবা প্রতিকূলতা তাঁর কলমকে থামিয়ে দিতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন সাংবাদিকের প্রথম দায় সত্যের কাছে, ক্ষমতার কাছে নয়।
কেউ পথ হারালে পথের সন্ধান চাইলে তিনি পথ দেখাতেন। সাংবাদিকতায় যারা নতুন, তাদের তিনি কেবল সংবাদ লেখার কৌশল শেখাননি; শিখিয়েছেন কীভাবে সমাজকে দেখতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয় এবং কীভাবে মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে হয়।
এই কারণেই রুকুনউদ্দৌলাহ শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাংবাদিক তৈরির এক জীবন্ত পাঠশালা।
নওগাঁয় তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে। অগ্রজ আসাদউদ্দৌলার কাছে থেকে নওগাঁ কেডি স্কুলে পড়াশোনা করার সময়ই দেশে বেজে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের দামামা।
রাজনৈতিকভাবে সচেতন তরুণ রুকুনউদ্দৌলাহ পরিবারের সঙ্গে ভারতে চলে যান। শিলিগুড়িতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তাই মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কাছে কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় ছিল না; ছিল জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও চেতনার গভীর ভিত্তি।
তিনি ধার করা ইতিহাসে বিশ্বাস করতেন না। নিজের চোখে দেখা, নিজের জীবনে অনুভব করা মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে তিনি লেখনীতে ধারণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের সংকট এবং স্বাধীনতার চেতনাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করতেন।
১৯৮৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক কল্যাণ প্রকাশিত হওয়ার সময় থেকেই রুকুনউদ্দৌলাহ পত্রিকাটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। জন্মলগ্ন থেকে তিনি এই পত্রিকার প্রাণশক্তির অন্যতম উৎস হয়ে ছিলেন।
একটি স্থানীয় পত্রিকাকে শুধু সংবাদ প্রকাশের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, মানুষের কথা বলার একটি শক্তিশালী মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রয়াস-তার সঙ্গে তাঁর অবদান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
যশোরের অগণিত সাংবাদিক তাঁর হাতে সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই আজ জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের সাফল্যের পেছনে রুকুনউদ্দৌলাহর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
তিনি সংবাদ তৈরি করেছেন, আবার সাংবাদিকও তৈরি করেছেন-এই দুটি কাজ একসঙ্গে করার সামর্থ্যই তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।
দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদ-এর সঙ্গে তিনি প্রায় পাঁচ দশক যুক্ত ছিলেন। তাঁর নিয়মিত কলাম ‘গ্রাম-গ্রামান্তরে’ পাঠকমহলে বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। গ্রামের মানুষের জীবন, প্রান্তিক মানুষের কথা এবং দেশের মাটির সঙ্গে যুক্ত বাস্তবতাকে তিনি তাঁর লেখায় তুলে আনতেন।
এ ছাড়া তিনি চ্যানেল আই ও রেডিও টুডেতেও কাজ করেছেন। যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্ফূলিঙ্গ, দৈনিক ঠিকানা, দৈনিক রানার ও দৈনিক কল্যাণে দীর্ঘদিন বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষপর্বে যশোর থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক যশোরের কাগজের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বজলুর রহমান স্মৃতিপদক, আইডিইবি পুরস্কার, যশোর শিল্পী গোষ্ঠী পদক ও জ্ঞানমেলা পদক।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠিত। মুক্তিযুদ্ধ, মানুষ, সমাজ ও জীবন নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে ‘গ্রাম-গ্রামান্তরে’, নবযুগ প্রকাশনী থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর’, নবরাগ প্রকাশনী থেকে ‘আমার কৈশোর আমার মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মানুষের ভাবনা মানুষের কথা’, ‘ছোট ছোট কথা অচেনা মানুষ’ এবং ‘পতাকার অক্ষত ভূমি’ তাঁর সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করে।
এই বইগুলো শুধু তাঁর লেখকসত্তার পরিচয় নয়; এগুলো একটি সময়কে ধরে রাখার প্রয়াস। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ ও যশোরের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার যে যোগসূত্র, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে।
আজকের সাংবাদিকতার বাস্তবতায় ফিরে তাকালে রুকুনউদ্দৌলাহকে কখনো কখনো রূপকথার চরিত্র বলে মনে হতে পারে। কারণ বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ কিংবা নানা ধরনের চাপের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
কিন্তু রুকুনউদ্দৌলাহ ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর মানুষ।
তিনি অর্থের কাছে বিক্রি হননি। দুর্দিনে আদর্শ থেকে সরে যাননি। ক্ষমতার কাছে মাথা নত না করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা প্রতিষ্ঠান-কোনোটিকেই তিনি অন্ধ আনুগত্য দিয়ে দেখেননি। বরং দেখেছেন প্রশ্ন করার চোখ দিয়ে।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের যে দৃষ্টিশক্তি যে চোখ দিয়ে সে সমাজকে দেখে, বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োজনে সবকিছুকে প্রশ্ন করে-সেই চোখটি তাঁর মধ্যে ছিল সহজাত।
যাঁরা তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন, তাঁরা জানেন রুকুনউদ্দৌলাহর কাছ থেকে সাংবাদিকতা শেখা মানে শুধু সংবাদ লেখা শেখা নয়। এর অর্থ ছিল সমাজকে পড়তে শেখা, মানুষের ভাষা বুঝতে শেখা, তথ্যের ভেতর থেকে সত্য খুঁজে বের করতে শেখা।
তাঁর হাত ধরে যশোর ও ঢাকার বহু সাংবাদিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কেউ সংবাদকক্ষে, কেউ মাঠের সাংবাদিকতায়, কেউ সম্পাদনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন।
তাঁদের সাফল্যের মধ্যে আজও রুকুনউদ্দৌলাহর শিক্ষার ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। বহুমাত্রিক শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহারে শব্দটির গুরুত্ব অনেকটাই ক্ষয় হয়েছে। কিন্তু রুকুনউদ্দৌলাহর ক্ষেত্রে ‘বহুমাত্রিক’ শব্দটি সত্যিই যথার্থ।
তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক, সংগঠক, শিক্ষকসুলভ অভিভাবক এবং সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ।
অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সুযোগহীন মানুষকে এগিয়ে নেওয়া এবং মানুষের মধ্যে বিভাজনের বদলে সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা এই মানবিক দর্শনই তাঁর জীবনকে অর্থবহ করেছে।
মৃত্যু মানুষকে শারীরিকভাবে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু আদর্শবান মানুষের মৃত্যু তাঁর চিন্তা ও কর্মকে শেষ করে না।
রুকুনউদ্দৌলাহ আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর লেখা আছে, তাঁর বই আছে, তাঁর স্মৃতি আছে, তাঁর হাতে তৈরি সাংবাদিকেরা আছেন, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ আছে।
আজকের সাংবাদিকতার সংকটময় সময়ে তাঁর মতো সাহসী, নির্মোহ ও মানবিক সাংবাদিকের প্রয়োজন আরও বেশি অনুভূত হয়।
তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই শুধু শোক নয়, আমাদের নিজেদের কাছেও একটি প্রশ্ন রেখে যেতে হয়-আমরা কি তাঁর দেখানো সাংবাদিকতার সেই পথ ধরে হাঁটতে পারছি?
সত্যের পক্ষে থাকা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, মানুষের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখা এসবই ছিল রুকুনউদ্দৌলাহর সাংবাদিকতার মূল দর্শন।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, একজন সাংবাদিকের কলম কেবল সংবাদ লিখতে পারে না; একটি সমাজের বিবেকও হয়ে উঠতে পারে।
রুকুনউদ্দৌলাহ সেই বিবেকেরই একজন নির্ভীক কণ্ঠ ছিলেন। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছি।
আর যতদিন সত্য, ন্যায়, সাম্য ও মানুষের মুক্তির কথা বলা হবে-ততদিন রুকুনউদ্দৌলাহর নামও উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধার সঙ্গে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, ছোটচাচা। আপনার অনুপস্থিতি আমাদের কাঁদায়, আর আপনার জীবন আমাদের পথ দেখায়।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক কল্যাণ
