সাজেদ রহমান
আজ সাংবাদিক ও বীরমুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহ ভাইয়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। একটি বছর পেরিয়ে গেছে, অথচ তাঁর সঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত, তাঁর সহজ-সরল কথাবার্তা, মানুষের প্রতি গভীর মমতা এবং গ্রামবাংলার মানুষের গল্প বলার অনন্য সেই সাংবাদিকসত্তা আজও স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর মতো একজন মানুষ ও সাংবাদিকের অনুপস্থিতি যে কতটা শূন্যতা তৈরি করে, তা সময় যত গড়াচ্ছে, ততই যেন উপলব্ধি করছি।
রুকুনউদ্দৌলাহ ভাই গ্রাম ঘুরতে ভালোবাসতেন। যশোরের প্রত্যন্ত অনেক গ্রাম তিনি ঘুরেছেন। গ্রামের মানুষ, তাদের জীবন, আনন্দ-বেদনা, অভাব-অভিযোগ, স্বপ্ন ও সংগ্রাম ছিল তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি সাধারণত একা গ্রামে যেতেন না। কোনো সহকর্মী কিংবা পরিচিত কাউকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। আমিও অনেকবার তাঁর সেই গ্রামভ্রমণের সঙ্গী হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।
গ্রামে গিয়ে তিনি কখনো বসে পড়তেন কোনো চায়ের দোকানে, কখনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁদের কথা শুনতেন মন দিয়ে। কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করতেন না। বরং মানুষকে কথা বলার সুযোগ দিতেন। সাধারণ মানুষের মুখের কথার মধ্য থেকেই তিনি খুঁজে নিতেন সংবাদ, খুঁজে নিতেন জীবনের গল্প। এরপর শহরে ফিরে সেই গল্পই দু’হাত খুলে লিখতেন। পত্রিকার পাতায় তাঁর লেখা পড়লে মনে হতো, এই মানুষগুলোর কথা যেন তিনি নিজের হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন।
দৈনিক সংবাদে তিনি নিয়মিত লিখতেন ‘গ্রাম গ্রামান্তরে’ নামে একটি কলাম। সেই কলামে উঠে আসত গ্রামবাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সংকট, মানবিকতা ও জীবনযাপনের নানা অনুষঙ্গ। তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি বড় ঘটনার মধ্যেই শুধু সংবাদ খুঁজতেন না; বরং ছোট ছোট ঘটনার মধ্যেও জীবনের বড় সত্যকে আবিষ্কার করতে পারতেন।
একবার তাঁর সঙ্গে ঝিকরগাছা গিয়েছিলাম। ফেরার পথে চাঁচড়া মোড়ে বাস থেকে নামলাম। সেখান থেকে একটি ভ্যানে করে দড়াটানা মোড়ে আসব। তখনকার সময়ে একটি ভ্যানে চারজন যাত্রী বসতেন। সম্ভবত ২০০৩ সালের দিকের ঘটনা। চাঁচড়া মোড় থেকে দড়াটানা পর্যন্ত ভ্যানভাড়া ছিল মাত্র তিন টাকা। চারজন যাত্রী হলে একজন ভ্যানচালকের আয় হতো ১২ টাকা।
ভ্যানে উঠে রুকুনউদ্দৌলাহ ভাই ভ্যানচালককে বললেন, ‘একটু দাঁড়ান। আরও যাত্রী আসুক, তারপর যাবেন।’
ভ্যানচালক যেন কথাটি শুনে অবাক হয়ে গেলেন। কারণ, তখনকার দিনে যাত্রীরা সাধারণত ভ্যানে উঠেই চালককে বলতেন, ‘চালান।’ কে আগে যাবে, নিজের সময় কীভাবে বাঁচবে—সেটিই যেন ছিল মুখ্য বিষয়। কিন্তু রুকুনউদ্দৌলাহ ভাইয়ের কথায় অন্যের কথাও ভাবার এক অসাধারণ মানবিকতা ছিল।
ভ্যানচালক তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন, যাত্রীরা ভ্যানে উঠেই শুধু নিজেদের স্বার্থের কথা ভাবেন। ‘আপনার মতো লোক আমি আর একদিন পেয়েছিলাম।’
শেষ পর্যন্ত তিনজন যাত্রী নিয়েই ভ্যানচালক রওনা দিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর এক মহিলা যাত্রী ভ্যানে উঠলেন। ভ্যানচালক তাঁকে বললেন, ‘দুই টাকার কম কিন্তু নেব না।’
মহিলা তখন ভীষণ বিপদগ্রস্ত। তাঁর এক ছেলে বিদ্যুৎ লাইনে কাজ করার সময় মারাত্মকভাবে তড়িতাহত হয়েছিল। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিল ছেলেটি। সেই দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা আর অসহায়তার মধ্যেই তিনি শহরের দিকে যাচ্ছিলেন।
যশোর শহরের ঈদগাহ মোড়ে মহিলা ভ্যান থেকে নামলেন। কথা অনুযায়ী শাড়ির আঁচলের গিঁট খুলে দুই টাকা দিতে গেলেন। কিন্তু ভ্যানচালক টাকা নিলেন না।
তিনি বললেন, ‘চাচি, আপনি বিপদে পড়েছেন। ভাড়া লাগবে না।’
মহিলা বারবার টাকা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। বিনীতভাবে অনুরোধ করলেন ভাড়া নেওয়ার জন্য। কিন্তু ভ্যানচালক কোনোভাবেই টাকা নিলেন না।
একজন সামান্য ভ্যানচালকের এই অসামান্য মানবিকতায় মহিলার দু’চোখের কোণে নোনা জল চিকচিক করে উঠেছিল। তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলেন। তারপর ভারী পায়ে তাঁর গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঘটনাটি হয়তো খুব ছোট। কয়েক টাকা ভাড়া, একজন বিপদগ্রস্ত নারী আর একজন দরিদ্র ভ্যানচালকের মানবিকতা এই তো ঘটনা। কিন্তু রুকুনউদ্দৌলাহ ভাইয়ের চোখে সেটি ছিল মানুষের মহত্ত্বের এক অসাধারণ গল্প। তিনি ঘটনাটি এত সুন্দর করে দৈনিক সংবাদের ‘গ্রাম গ্রামান্তরে’ কলামে লিখেছিলেন যে, এত বছর পরও ঘটনাটি আমার স্পষ্ট মনে আছে।
আসলে রুকুনউদ্দৌলাহ ভাই এমনই সাংবাদিক ছিলেন। তিনি ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে মানুষের বড় পরিচয় খুঁজে পেতেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা শুধু তথ্য পরিবেশনের বিষয় ছিল না; সাংবাদিকতা ছিল মানুষের কাছে যাওয়া, মানুষের কথা শোনা এবং সেই কথাগুলো সমাজের সামনে তুলে ধরা। তাঁর লেখায় তাই গ্রামের মাটি, মানুষের ঘাম, দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা এবং মানবিকতার গন্ধ পাওয়া যেত।
তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের গল্পের মূল্য আছে। যে ভ্যানচালক হয়তো সমাজের চোখে একজন অতি সাধারণ মানুষ, তাঁর মধ্যেও যে অসাধারণ মানবিকতা থাকতে পারে রুকুনউদ্দৌলাহ ভাই সেই সত্যটিই তুলে ধরেছিলেন। তাঁর সাংবাদিকতার সৌন্দর্য ছিল এখানেই। তিনি মানুষকে বড় বা ছোট করে দেখতেন না। মানুষের জীবনই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়।
রুকুনউদ্দৌলাহ ভাই ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। ধর্ম-বর্ণের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতেন। যশোরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস কিংবা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাঁকে যথাসময়ে যশোরের বিজয়স্তম্ভে কিংবা শহীদ মিনারে দেখা যেত।
কোনো সংগঠন তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে কি না, সেটি তাঁর কাছে বড় বিষয় ছিল না। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তাঁর কাছে ছিল নিজের দায়িত্ব। অনেক সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সংগঠনের পরিচয়ের চেয়েও তাঁর বড় পরিচয় ছিল তিনি একজন সচেতন, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন।
তাঁকে দেখেছি দায়িত্ববোধ নিয়ে ছুটে যেতে। কোনো দিবস এলে আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়, নিজের বিশ্বাস থেকে তিনি উপস্থিত হতেন। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা।
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর কলম। আর সেই কলমের শক্তি তখনই মানুষের কাজে লাগে, যখন সাংবাদিক মানুষের কাছাকাছি যেতে পারেন। রুকুনউদ্দৌলাহ ভাই মানুষের কাছে গিয়েছিলেন। গ্রামের পথে হেঁটেছেন, চায়ের দোকানে বসেছেন, ভ্যানচালকের সঙ্গে কথা বলেছেন, সাধারণ মানুষের ঘরে ঢুকেছেন, তাঁদের দুঃখ শুনেছেন। তারপর সেই মানুষগুলোর কথা নিজের ভাষায় তুলে ধরেছেন সংবাদপত্রের পাতায়।
তাঁর ‘গ্রাম গ্রামান্তরে’ কলামটি ছিল গ্রামবাংলার মানুষের জীবনের এক অনানুষ্ঠানিক দলিল। সেখানে বড় বড় ব্যক্তির জীবনকথার চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। একজন কৃষক, একজন শ্রমজীবী মানুষ, একজন ভ্যানচালক কিংবা কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষকের জীবনও তাঁর লেখায় আলাদা মর্যাদা পেত।
আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, রুকুনউদ্দৌলাহ ভাই আসলে আমাদের শুধু কিছু লেখা দিয়ে যাননি; দিয়ে গেছেন মানুষকে দেখার একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি শিখিয়েছেন, সংবাদ শুধু শহরের বড় ভবনে ঘটে না, সংবাদ লুকিয়ে থাকে গ্রামের মেঠোপথে, চায়ের দোকানে, কৃষকের ঘামে, ভ্যানচালকের প্যাডেলে, অসহায় মায়ের চোখের পানিতে এবং একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ মানবিকতায়।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। মানুষের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়, পরিচিত মুখগুলো স্মৃতির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে থেকে যান। রুকুনউদ্দৌলাহ ভাইও তেমনই একজন। তাঁর লেখা, তাঁর ‘গ্রাম গ্রামান্তরে’, তাঁর সঙ্গে গ্রাম ঘোরার স্মৃতি এবং মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মমতা তাঁকে আমাদের কাছে বাঁচিয়ে রাখবে।
আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছি। মনে পড়ছে সেই গ্রামবাংলার পথ, চায়ের দোকান, ভ্যানের ধীর গতি আর মানুষের ছোট্ট ছোট্ট গল্প। মনে পড়ছে একজন সাংবাদিকের কথা, যিনি বড় হওয়ার জন্য বড় মানুষদের কাছে ছোটেননি; বরং ছোট মানুষের কাছে গিয়ে তাঁদের জীবনের বড়ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন।
রুকুনউদ্দৌলাহ ভাই নেই। কিন্তু গ্রামবাংলার মেঠোপথে, মানুষের গল্পে, সংবাদপত্রের পুরোনো পাতায় এবং আমাদের স্মৃতিতে তিনি আজও হেঁটে চলেছেন। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
সাজেদ রহমান
২১-আগস্ট-২০২৬
