জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালককে হারিয়ে শোকস্তব্ধ যশোর
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন (জেসিএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, বিশিষ্ট সমাজসেবক ও মুক্তিযোদ্ধা আজাদুল কবির আরজু আর নেই। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।
তার আকস্মিক প্রয়াণে যশোরসহ দেশের উন্নয়ন ও সমাজসেবা খাতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। একজন দক্ষ সংগঠকের বিদায়ের চেয়েও বড় কথা—মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক অভিভাবকতুল্য মানবিক মুখ হারালো সমাজ।
শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিকেলে টাউন হল মাঠে মরদেহ
পারিবারিক সূত্র জানায়, শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় মরহুমের মরদেহ জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেওয়া হবে। এরপর বিকেল ৪টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে যশোর টাউন হল মাঠ সংলগ্ন ঈদগাহ ময়দানে। বাদ আসর সেখানেই তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
মরহুম আজাদুল কবির আরজু তার মরদেহ যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দান করে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তবে প্রক্রিয়াগত কোনো জটিলতা দেখা দিলে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামে তাকে দাফন করা হবে।
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন, হাসপাতালে মৃত ঘোষণা
পরিবারের সদস্যরা জানান, শনিবার সকালে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাজেদ নওয়াজ।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন বলেও জানা গেছে।
শৈশব থেকেই মানবিক মনন, তারুণ্যে সাংস্কৃতিক চর্চা
আজাদুল কবির আরজু ১৯৫৩ সালের ২৮ আগস্ট যশোর সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা একেএম আমজাদ আলী এবং মা আনোয়ারা বেগম। গ্রামে জন্ম হলেও বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে শহরেই তার বেড়ে ওঠা।
শৈশব-কৈশোর থেকেই তিনি ছিলেন শৈল্পিক ও সংবেদনশীল মননের মানুষ। আবৃত্তি, অভিনয়, গল্প-কবিতা লেখা, দেয়ালপত্রিকা প্রকাশসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণ বয়সেই গড়ে তুলেছিলেন নিজের মানবিক সত্তা।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ, নির্যাতন, কারাবরণ—তারপরও থামেননি
রাজনীতি সচেতন তরুণ আরজু স্বাধীন দেশের স্বপ্নে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি রাজাকারদের হাতে আটক হন। নির্মম নির্যাতনের পর তাকে তুলে দেওয়া হয় পাকবাহিনীর হাতে। পরবর্তীতে তাকে যশোর কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর তিনি মুক্তি পান।
সেই অন্ধকার দিনগুলোর যন্ত্রণা তাকে ভেঙে দেয়নি—বরং মানুষের জন্য কাজ করার শক্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
জাগরণীর জন্ম ১৯৭৫ সালে—অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শপথ
১৯৭৫ সালে কয়েকজন সমমনা বন্ধুকে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাগরণী চক্র’। যশোর শহরে শুরু করেন ব্যবহারিক বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র—যার শিক্ষার্থী ছিলেন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী।
সেই ছোট্ট শুরু থেকে অর্ধশত বছরের পথচলায় জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন আজ দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, মানবাধিকার এবং সমাজ উন্নয়নে তার আজীবনের সংগ্রাম তাকে সমাজসেবা খাতের উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত করেছে।
বিনয়ী নেতৃত্ব, অভিভাবকতুল্য মানুষ—অপূরণীয় শূন্যতা
সহকর্মী ও পরিচিত মহলে আজাদুল কবির আরজুকে সবাই চিনতেন একজন বিনয়ী, নিরহংকারী ও অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে। তার পেশাদারিত্বে যেমন ছিল শৈল্পিক ছোঁয়া, তেমনি ছিল প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক অদম্য প্রত্যয়।
তার মৃত্যুতে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গুণীজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। উন্নয়ন ও সমাজসেবা খাতে সৃষ্টি হয়েছে অপূরণীয় শূন্যতা—যে শূন্যতা শুধু কর্মক্ষেত্রে নয়, মানুষের হৃদয়ের ভেতরেও দীর্ঘদিন থেকে যাবে।
পঞ্চাশ বছর পূর্তির পরই চিরবিদায়
উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়ারি জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন জাগরণের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদযাপন করে। সেই উদযাপনের রেশ কাটতে না কাটতেই আজাদুল কবির আরজুর বিদায় যেন সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আরও গভীর বেদনা হয়ে নেমে এসেছে।
যশোরের মানুষ বলছেন—“আজ একজন মানুষ নয়, একটি মানবিক অধ্যায় বিদায় নিল।”
