মো. ছোলজার রহমান: যশোর শহরের জিলা স্কুলের পূর্ব দক্ষিণে ষষ্ঠীতলাপাড়ায় মুজিব সড়ক সংলগ্ন ছবি টাওয়ার (আড়ং) এর পিছনে প্রায় ৮০ শতাংশ সরকারি খাস জমির জলাশয়টি পাশে অবস্থিত রোটারী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লীজ গ্রহণ করেছিল। গত বছর থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটিকে ভরাটের জন্য সামান্য সামান্য ভিত বালি ফেলে আসছিল।
গত নভেম্বর মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মুজিব সড়কের পূর্ব পাশর্^ বন্ধ করে মাটি রেখে অর্ধবেলা জুড়ে ভ্যানে করে পুকুরে ফেলে অর্ধেকটা এলাকা বন্ধ করতে সক্ষম হয়। কয়েকদিন পূর্বে হাসপাতালটির ২৫ বর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানও সেখানে অনুষ্ঠিত হয়।
পুকুরের পূর্ব পাশের্^র ১০/১৫ টি বাড়ির গৃহস্থালি পানি নির্গমন হতো এই পুকুরে। সেটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে বাড়িঘরসমূহের মালিকগণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান যে একটু ড্রেন রেখে পুকুরে পানি আসার পথ রাখার জন্য। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বর্জ পানি নির্গমনের সুযোগ দিতে সম্মত হয়নি। গত ৫ ডিসেম্বর পুকুর পাড়ের বাসিন্দাগণ ওয়ার্ড কমিশনারকে নিয়ে এসে পুকুর ভরাট কাজে বাঁধা দেয়। বন্ধ থাকে পুকুর ভরাট করার কাজ। ৭ ডিসেম্বর প্যানেল মেয়রসহ বেশ কয়েকজন এসে রোটারী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ভরাটকৃত বালি সরিয়ে পুকুরকে বহাল রাখার নির্দেশ দেন।
পৌরসভার পক্ষ থেকে এরুপ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। তারপর কিছু কথা ভেবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ জানাচ্ছি। যতটুকু জেনেছি তাতে বোঝা যায় যে, পুকুরটি ২ মেয়াদে দীর্ঘদিনের জন্য লীজ নেয়া হয়েছিল। প্রথম লীজের সময় কারণ দেখানো হয়েছিল-প্রয়োজনীয় সংস্কার করে মাছ চাষ করে সেই আয় দিয়ে হাসপাতালের ব্যয় ও গরীব রোগীদের চিকিৎসা করানো হবে।
সেসময় কিছুটা অংশ ভরাট করে বড় একটি শেড তৈরি করে বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করা হয়েছিল এবং উত্তর ও পূর্ব দিকের জমির মালিকগণ সীমানা ঘেঁষে এমনভাবে বহুতল ও একতলা বাড়িঘর তৈরি করেছিল যে পৌরসভার আইনে ২/৩ ফুট যায়গা ছেড়ে নির্মানের বিধানকে মানা হয়নি। কেহ কেহ মত প্রকাশ করেন যে, উত্তরদিকে গড়ে ওঠা মন্দিরের একাংশ ও সংলগ্ন বাড়িঘরের সামান্য অংশ খাস জমির মধ্যে পড়েছে। মেপে দেখা না হলেও কেহ কেহ বলেন যে পূর্ব ও দক্ষিণেও সামান্য একটু করে দখল ও রেকর্ড করে ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে। গত বছর থেকে নতুন করে ব্যাপক আকারে ও প্রকাশ্যে ভরাট শুরু হওয়ায় এবং দখল ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেওয়ায় এরুপ পদক্ষেপ নেয়া হলো।
খাসজমি সংরক্ষণ, দেখভাল ও লীজ প্রদানের ক্ষমতা জেলা প্রশাসনের হাতে ন্যস্ত। প্রায় ৮০ শতাংশের এ জমির দখল উচ্ছেদ করার ক্ষমতাও জেলা প্রশাসনের রয়েছে। চতুর্দিকে এরুপ কোন সীমানা পিলার বা সীমানা চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না বলেই পাশর্^বর্তী লোকজন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে।
নতুন আইনে রেকর্ডমূলে মালিকানা গ্রহণযোগ্য নহে এবং পুরো খাস এলাকা সংরক্ষণ জরুরী। জলাশয় ও পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। উচ্ছেদ ও দখলমুক্তকরণ নির্ভর করছে জেলা প্রশাসনের সদিচ্ছা ও সক্ষমতার উপর। রাস্তার উপর উপকরণাদি রেখে জনগণ ও যানবাহনের চলাচলকে বাঁধাগ্রস্ত করে এমন কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য যশোর পৌরসভা কর্তৃপক্ষের প্রচারিত বিজ্ঞপ্তি সিটি ক্যাবলে কয়েক বছর ধরে দেখেও আসছি।
তা সত্বেও সন্ধ্যা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত ব্যস্ততম প্রধান সড়কের অর্ধেক অংশ বালি রেখে বন্ধ করে অনেকটা দাপটের সাথে প্রায় দেড়মাস ধরে ভরাট কার্যক্রম চললেও তা দৃষ্টিগোচর হলো না কিন্তু যখনই কয়েকটি বাড়িঘরের ময়লা পানি যেতে অসুবিধা হলো- তখনই তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া হলো।
লীজের শর্তে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এরুপ প্রসঙ্গ লিখিত থাকার কথা, কিন্তু ৬০ ভাগ জমির শ্রেণি পরিবর্তন হবার পরও এটি দৃষ্টিগোচর না হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দু:খজনক। পুকুর ভরাটের এ পর্বে কাজ শুরুর সময় পুকুরটিকে একটি দূষিত ভাগাড় বলে মনে হচ্ছিল এবং মশা উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে পড়েছিল। এরুপ পরিস্থিতি বন্ধকরণে কেউই এগিয়ে আসেননি।
যেখানে কারও কোন দায় ছিল না সেখানে পৌর ড্রেনের সাথে ময়লা নির্গমন সংযোগ না দিয়ে পুকুরটিকে ময়লা নির্গমনের ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য এতটা আগ্রহ কি কোন দায় পালনকে সমর্থন করে? ২০২১ সালের গরমের তীব্রতা, ভূপৃষ্ঠস্থ জলাধার সংরক্ষণ, মৃত্তিকার আর্দ্রতা সংরক্ষণ এবং পরিবেশিক দিক বিবেচনা করা হলে এটি উদ্ধার করে পরিস্কার পানির উৎসে পরিণত করা প্রয়োজন। চতুর্দিকের বাড়িঘরের ময়লা পানি ও আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা প্রয়োজন। মশার উপদ্রব, ডেঙ্গুর প্রকোপ এবং জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক,ভূগোল ও পরিবেশ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ,যশোর।)