আব্দুল্লাহ সোহান, মণিরামপুর: যশোরের মণিরামপুরের টুনিয়াঘরা গ্রামের মধ্যে বেগারীতলা বাজার। বাজারের ভেতর দিয়ে গেছে যশোর-সাতক্ষীরা আঞ্চলিক মহাসড়ক। পাশেই আবু তালেব খাঁর হোটেল। শুক্রবার সকালে সেখানে কেউ নাশতা করতে এসেছিলেন।
কেউ নাশতা শেষ করে পাশের চায়ের দোকানে বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ একটি কাভার্ড ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েকটি দোকানে আঘাত করে একটি খাবার হোটেলে ঢুকে পড়ে। তছনছ করে দিয়ে গেছে সবকিছু। কেড়ে নিয়েছে বাবা-ছেলেসহ পাঁচটি প্রাণ।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন মণিরামপুর উপজেলার টুনিয়াঘরা গ্রামের হাবিবুর রহমান (৫৫) ও তার ছেলে তাওশিদ হোসেন (৭), একই গ্রামের মীর সামছুর রহমান (৬০) ও তৌহিদুর রহমান (৩৮) এবং জয়পুর গ্রামের আবদুল মমিনের ছেলে জিয়ারুল ইসলাম (৩৫)।
নিহত হাবিবুর রহমান কৃষক এবং মীর সামছুর রহমান, তৌহিদুর রহমান ও জিয়ারুল ইসলাম দিনমজুর। এই গ্রামের চারজন ও পাশের গ্রামের আরেকজনের মৃত্যুতে ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দুর্ঘটনার ঠিক আগমূহূর্তে হোটেলের ভেতর থেকে পরোটা নিয়ে সামনের দিকে একজন গ্রাহককে দিতে যাচ্ছিলেন মালিক আবু তালেব খাঁ। তার বর্ণনা অনুযায়ী, গতকাল সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হাবিবুর রহমান তার ছেলে তাওশিদ হোসেনকে নিয়ে মহাসড়কের পাশ দিয়ে এই হোটেলে নাশতা করতে আসছিলেন।
মীর সামছুর রহমান ও তৌহিদুর রহমান হোটেল থেকে নাশতা করে পাশের নূরুল আমিনের চায়ের দোকানের চৌকিতে বসে কথা বলছিলেন। জিয়ারুল ইসলাম হোটেলে নাশতা খেয়ে বিল পরিশোধের জন্য কাউন্টারের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আবু তালেব বলেন, হঠাৎ একটি কাভার্ড ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিকট শব্দ করতে করতে মহাসড়কের পাশের কয়েকটি দোকানে সামনের দিকে আঘাত করে হোটেলে ঢুকে পড়ে। তিনি ভয়ে হোটেলের পেছনের দিকে দৌড় দেন। চোখের সামনে কাভার্ড ভ্যানের চাপায় পাঁচজন মারা যান। তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। তবে তার হোটেল ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। এতে তার প্রায় ২০ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে।
মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি কাভার্ড ভ্যান পাশের একটি হোটেলে ঢুকে পড়ায় পাঁচজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। কাভার্ড ভ্যানটি আটক করা হয়েছে। তবে চালক ও চালকের সহকারী পালিয়ে গেছেন। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
এদিকে, বাড়ির সামনে স্বামী আর আদরের ছোট ছেলের এমন মৃত্যুতে মুহূর্তেই নির্বাক হয়ে যায় মা তহমিনা খাতুন। ঘটনার পর থেকে তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কাউকে দেখলে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকছেন। কোনো কথা বলছেন না। মাঝে মাঝে সন্তানের নাম ধরে আহাজারি করছেন। স্বামী আর সন্তানহারা এই মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে টুনিয়া ঘরার আকাশ বাতাস। অনেকেই শান্তনা দেওয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছে।
কান্না কণ্ঠে তহমিনা খাতুন বলেন ‘আমার কলিজার টুকরারে এভাবে আল্লাহ নিয়ে গেলো। সন্তানের সাথে আমার স্বামীরেও। আমি কি করে সহ্য করবো আল্লাহ। আমার ঘরটা একপ্রকার ফাঁকা করে চলে গেল। আমার পাখিটা কত মা মা করে পাগল করে দেয়; আর ডাকবে না রে…. আল্লাহ।
টেলিভিশন দেখতে দেখতে সকালে ছোট ছেলে বায়না ধরেছিলো পরাটা খেয়ে মাদ্রাসায় যাবে। সেই পরাটাও খেতে পারলো না রে……। আকাশের দিকে দুই হাত তুলে আর্তনাদ করে তিনি বলতে থাকেন, ‘কি এমন পাপ করেছিলাম আল্লাহ; যার কারণে একসঙ্গে আমার স্বামী আর ছোট ছেলেরে এভাবে কেড়ে নিতে হলো! এখন আমি কি নিয়ে বাঁচবো। আমাদের কি হবে আল্লাহ। একসঙ্গে আমাদের দুটি প্রাণ নিয়েছে যারা তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে সরকারকে।