এসআই ফারদিন: চলতি বছর যশোরে হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্তত ৩০টি ছিলো বেশি আলোচিত। এরমধ্যে চৌগাছায় দুই ভাইকে কুপিয়ে, যশোর শহরে যুবদল নেতা বদিউজ্জামান ধনি, যুবলীগ কর্মী ইয়াসিন আরাফাত হত্যাকাণ্ড, অভয়নগরে একসাথে মা ও দুই মেয়েকে হত্যার ঘটনা নাড়া দেয় প্রশাসনকে। খুনের তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগ নেতা। আছে ইউপি মেম্বার, হিজড়া ও নারীরা।
আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, জমি নিয়ে বিরোধে এসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে আইনশৃংখলা বাহিনী নিশ্চিত হয়েছে। খুনের সাথে জড়িত অধিকাংশই পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন। জেলা পুলিশ ব্রিফিং করে সাংবাদিকদের সেই সব তথ্য জানিয়েছেন।
বছরের শুরুতে গত ৮ জানুয়ারি যশোর-ছুটিপুর সড়কের হালসা ব্রিজের কাছে বহুল আলোচিত লাবনী ওরফে লাভলী (৩৫) নামে এক হিজড়াকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা শাকিল পারভেজসহ (২১) জড়িত চার আসামিকে পুলিশ ধরতে সক্ষম হয়।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শহরের বেজপাড়া চোপদারপাড়ার ব্রাদার্স ক্লাবে যুবলীগ কর্মী ইয়াসিন আরাফাতকে (২৮) কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা। পরদিন এই ঘটণায় ডিবি পুলিশ রানা ও রুবেল নামে দু’জনকে আটক করে।
২৫ মার্চ শহরের পুরাতন কসবা কাঁঠালতলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একই গ্রুপের লোকজন কুপিয়ে হত্যা করে যুবলীগ কর্মী রুম্মানকে (৩১)। এ সময় একই এলাকার বাবু ড্রাইভারের ছেলে আরিফ হোসেন শাকিল (৩০) আরেক যুবলীগ কর্মী ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত হয়। রুম্মান হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি শহরতলীর শেখহাটির বিপুল হোসেন ও আলিম হোসেন হৃদয়কে গ্রেফতার করে আইন শৃংখলাবাহিনী।
২ এপ্রিল যশোর রেলরোডস্থ পঙ্গু হাসপাতালের লিফটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ব্যবসায়ী মফিজুর রহমান শেখের (৬৫) মরদেহ। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে লেনাদেনার বিরোধের কারণে তাকে লোকজন দিয়ে হত্যা করে লাশ লিফটের গ্রাউন্ড ফ্লোরের নিচে লুকানো হয়।
৭ এপ্রিল চৌগাছার টেঙ্গুরপুর গ্রামে দুই ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষরা। এরা হলেন আইয়ুব হোসেন (৬৫) ও ইউনুস আলী (৫৫)। কথা কাটাকাটির জের ধরে একই গ্রামের কয়েকজন কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে তাদের হত্যা করে। অবশ্য পুলিশ তাৎক্ষণিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত বিপুল ও মুকুল, বিপুলের স্ত্রী বিলকিচ খাতুন এবং বিপুলের মা রিজিয়া বেগমকে আটক করে।
১৬ এপ্রিল বেনাপোলের কাগজপুকুরের মগর আলীকে (৬৪) কুপিয়ে হত্যা করে। তিনি বেনাপোল পৌর আওয়ামী লীগের চার নম্বর ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক ও শ্রমিক নেতা ছিলেন। পুলিশ আসামি ভাতিজা হারুন (৫৪) ও সামছুর রহমানকে (৬০) আটক করে।
২৯ মে শহরের নাজির শংকরপুর সিটি মডেল একাডেমির সামনে আফজাল হোসেনকে (৩৫) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ মামালায় টেরা সুজন, জাহিদ, মিলন ও বিপ্লব গাজীকে আটক করে সিআইডি। পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভি ও আহাদকে আটক করা হয়।
৩০ মে হারানো যৌবন ফিরে পেতে বাঘারপাড়ার দরাজহাটের পাইকপাড়া গ্রামে ধানকাটা শ্রমিক নকিম উদ্দীনকে (৬০) নৃশংসভাবে হত্যা করেন লিটন মালিতা (৪০)। লিটনকে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা থেকে নিহতের পুরুষাঙ্গ, অণ্ডকোষ, একটি চোখসহ গ্রেপ্তার করে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা।
গত ৭ জুন শহরের খালধার রোডে সাত মামলার আসামি আশিকুর রহমান অপুকে (৩৫) কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ।
গত ২১ জুন শার্শার বাগআঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আশানুজ্জামান বাবলু ওরফে গোল্ড বাবলুকে (৪৫) বেনাপোল পোর্ট থানার বালুন্ডা বাজারে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ মামলার প্রধান আসামি হাকিম ও আসানুরকে আটক করে র্যাব।
১২ জুলাই প্রকাশ্যে দিবালোকে শংকরপুর আকবরের মোড়ে নিজ বাড়ির সামনে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন যুবদল নেতা বদিউজ্জামান ধনি। এঘটনায় পুলিশ চার জনকে গ্রেফতার করে।
গত ১৫ জুলাই অভয়নগর উপজেলার চাঁপাতলা গ্রামে জহিরুল ইসলাম বাবু তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বীথি (২৮), শিশু কন্যা সুমাইয়া (৯) ও সাফিয়াকে (১৮ মাস) শ্বাসরোধে হত্যা করে। পুলিশ জানায়, তিনজনকে খুন করার পর বাবু বাড়িতে ফিরে যান। এরপর পরিবারের সদস্যরা তাকে পুলিশে সোপর্দ করে।
গত ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় পঞ্চাশোর্ধ্ব রওশনারা বেগম রোশনীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত রোশনি শহরের আশ্রম মোড়ের বাসিন্দা সাবেক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমান মনুর স্ত্রী। পুলিশ দরজা ভেঙে ঘরের মধ্যে বক্স খাটের ভেতরে লুকিয়ে রাখা রোশনির গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে। স্বর্ণালংকার লুটতে তারই বোনের ছেলে হৃদয় এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এ ঘটনায় নিহত রোশনীর বোনের ছেলে রিয়াজুল ইসলাম হৃদয়, তার মা আসমা বেগম, একই এলাকার আব্দুল বোরহান ও নাহিদ হাসানকে পিবিআই আটক করে জেল হাজতে পাঠায়।
গত ১ অক্টোবর আপেল খাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সানজিদা জান্নাত মিষ্টি (৪) নামের শিশুকে শ^াসরোধে হত্যা করা হয়। তার বাড়ি সদরের আরবপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের পতেঙ্গালী গ্রামে। হত্যার ঘটনাটি গোপন করতে চালের ড্রামের মধ্যে লুকিয়ে রাখে তার দেহ। পুলিশ ওইদিন রাতেই আসামি আটক করে।
২১ নভেম্বর সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত আসাদুজ্জামান আসাদ ওরফে বুনো আসাদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ৮ নভেম্বর রাতে নিজ এলাকা শহরের বেজপাড়া সাদেক দারোগার মোড়ে হামলার পর ২১ নভেম্বর দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। তিনি জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তার নামে হত্যাসহ একাধিক মামলা ছিল। এ মামলায় পুলিশ খাবড়ি হাসান ও সুমনকে আটক করে।
২২ ডিসেম্বর যশোরে ইসলামী যুব আন্দোলন যশোর জেলা শাখার সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক এরফান ফারাজী (২৮) ছুরিকাঘাতে নিহত হন। এ হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর মামলা হলেও কোন আসামি আটক হয়নি।
গত ২৪ ডিসেম্বর সদরের চুড়ামনকাটির দোগাছিয়া গ্রামের বাড়িতে থাকা তালাকপ্রাপ্ত মেয়ে রুমা খাতুনের হাতে মা আকলিমা বেগম খুন হয়। এ ঘটনায় রোববার সকালে পুলিশ ঘাতক মেয়ে রুমা খাতুনকে আটক করে।
এছাড়াও গত ১১ এপ্রিল চৌগাছায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক কাইয়ুম আলীর (৫৫) গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৫ মে যশোর সদরের চাঁনপাড়ায় মাদকসেবী পিতা নুরুল ইসলামের ছেলে রুহুল আমিনকে (১৩) ঘরের ভেতর বৈদ্যুতিক শক দিয়ে ও গলাটিপে হত্যা করে। ওইদিনই পিতাকে আটক করে পুলিশ। ২২ মে সদরের সুজলপুর গ্রামে ইরিয়ান গাজী (২৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে ও ছুরি মেরে হত্যা করে স্থানীয় প্রতিপক্ষরা।
একইদিন সদরের কৃষ্ণবাটি গ্রামের পশ্চিমপাড়া থেকে রাসেল হোসেনের (২৪) অর্ধগলিত ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ৯ জুন সদরের খোলাডাঙ্গা রেললাইনের পাশে ফজলে করিম বিশ্বাসের পারিবারিক কবরস্থান থেকে মুখে গামছা ঢুকানো উলঙ্গ অবস্থায় লাভলু হোসেন (৩৮) নামে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২৮ জুন স্ত্রীকে ইভটিজিং করায় বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে মহিরণ গ্রামের মোহাম্মদ রিপন (৩০) নামে এক মাইক্রোবাস চালককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
৩০ আগস্ট শার্শার বালুন্ডা গ্রামে শফিকুল ইসলামের মেয়ে রিক্তা খাতুন (১৮) নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা করে তার স্বামী। একইদিন বিকেলে শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া কয়লাপট্টি পেপসি কোম্পানির অফিসের বাহিরে আনসার হোসেন শানুকে ডেকে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা।
২ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শানু মারা যায়। ১ সেপ্টেম্বর মণিরামপুরের খেদাপাড়ার গালদা মানিকতলা গ্রাম থেকে ইয়াসিন বিশ^াস (৩৫) নামে এক যুবকের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ৪ সেপ্টেম্বর ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় সাতক্ষীরা জেলার সুলতানপুর শাহাপাড়ার মোস্তাফিজুর রহমান (৩৫) নামে এক যুবককে। ২৩ সেপ্টম্বর সদরের চুড়ামনকাটি রেলওয়ে স্টেশন থেকে কাজীর বাগানে ধরে নিয়ে গিয়ে আলম মন্ডল (৪৫) নামে এক রিকসা চালককে পিটিয়ে এবং পায়ের রগ কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
২ অক্টোবর শহরের চাঁচড়া ব্রাহ্মণপাড়ার শ্মশানের পাশে ডোবা থেকে হত্যা, অস্ত্র, মাদকসহ নয়টি মামলার আসামি রনি হোসেনের (২৫) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৩ নভেম্বর সীমান্তবর্তী উপজেলা শার্শায় মনির হোসেন (৩২) নামে এক ভ্যানচালককে পিটিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৪ ডিসেম্বর বেনাপোলে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের দায়েরে কোপে মিজানুর রহমান (৬৫) নামে এক কৃষক খুন হন।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি তাজুল ইসলাম বলেন, সব হত্যার ঘটনায় পুলিশ আসামিদের আটক করতে পেরেছে। হত্যাকাণ্ডগুলো আচমকা ঘটে। তবে পুলিশ মামলাগুলো উদঘাটন করতে পেরেছে। পুলিশ সকল অপরাধীর আইনের আওতায় আনতে বদ্ধপরিকর।