বিয়ের আনন্দযাত্রা মুহূর্তে শোকে; দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল চুষনি, জুতা আর কাচের টুকরা
খুলনা প্রতিনিধি
নতুন বউকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল বাড়ি। উঠানে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের কোলাহল থাকার কথা ছিল। হাসি-আনন্দে ভরে ওঠার কথা ছিল পুরো বাড়ি। কিন্তু সেখানে এখন শুধু কান্না আর আহাজারি। একসঙ্গে সাজানো হয়েছে নয়টি খাটিয়া, পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে নয়টি কবর। বিয়ের আনন্দযাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে মৃত্যুমিছিলে।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ৯ জন। শোকের ছায়া নেমে এসেছে দুইটি পরিবার ও পুরো এলাকায়।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বিয়ের আনন্দ থেকে শোকের মিছিল
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের নাকশা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার (মিতু)-এর সঙ্গে মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান ছাব্বিরের বিয়ে হয়।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বরপক্ষ নববধূকে নিয়ে মোংলার উদ্দেশে রওনা হয়। একটি মাইক্রোবাসে ছিলেন বর-কনেসহ দুই পরিবারের সদস্যরা।
গন্তব্য থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় মাইক্রোবাসটি। ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হন। আহত একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
একই পরিবারের ৯ প্রাণ
দুর্ঘটনায় নিহত একই পরিবারের সদস্যরা হলেন-বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া (ঐশী), ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা (পুতুল) এবং তাঁদের তিন সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম।
অন্যদিকে কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগমের মরদেহ নেওয়া হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলায়। নিহত হয়েছেন মাইক্রোবাসের চালক নাঈমও।
নিহত নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতু, তার বোন লামিয়া ও দাদি রাশিদা বেগমের খুলনায় জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় খুলনার কয়রার নাকশা গ্রামে বাড়ির পাশে মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
স্থানীয়রা জানায়, সালামের মা রাশিদা বেগম, মেয়ে নববধূ মিতু ও ছোট মেয়ে লামিয়ার মরদেহ গ্রামের বাড়ি নাকশায় আনার পর গতকাল সকালে তাদের জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কনের নানির মরদেহ তাদের গ্রামে দাফনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
৯ মসজিদ থেকে আনা খাটিয়া
শুক্রবার ভোরে নিহতদের মরদেহ মোংলার শেহালাবুনিয়া এলাকায় বরপক্ষের বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে শোকের মাতম শুরু হয়। শত শত মানুষ শেষবারের মতো তাদের দেখতে ভিড় করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া এনে মরদেহগুলো রাখা হয়। গোসল শেষে একে একে তাতে তোলা হয় স্বজনদের নিথর দেহ।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা শেষে তাঁদের দাফন করা হয় মোংলা পৌর কবরস্থানে। সেখানে পাশাপাশি একই পরিবারের ৯টি কবর খোঁড়া হয়েছে।
মোংলা পৌর কবরস্থানের গোরখোদক মুজিবুর ফকির বলেন, “১৮-২০ বছর ধরে কবর খুঁড়ছি। কিন্তু একদিনে একই পরিবারের ৯টি কবর কখনো খুঁড়তে হয়নি। এমন দৃশ্য জীবনে দেখিনি।”
দুর্ঘটনাস্থলে নীরব সাক্ষী একটি চুষনি
দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পরও শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় কাচের টুকরা, গাড়ির ভাঙা অংশ, জুতা-স্যান্ডেল। এর মাঝেই পড়ে ছিল শিশুদের একটি চুষনি।
মায়েরা হয়তো শিশুদের শান্ত রাখতে চুষনি মুখে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মা-সন্তান কেউই আর বেঁচে নেই। রাস্তার ওপর পড়ে থাকা সেই ছোট্ট চুষনি যেন পুরো ট্র্যাজেডির নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “বিকট শব্দ শুনে ছুটে এসে দেখি দুই গাড়ির সংঘর্ষ। চারদিকে রক্ত আর আহত মানুষ। এমন ভয়াবহ দৃশ্য জীবনে দেখিনি।”
একদিনে ভেঙে গেল পুরো পরিবার
এই দুর্ঘটনায় বরপক্ষের পরিবার প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আব্দুর রাজ্জাকের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে দুর্ঘটনায় তাঁর দুই ছেলে, এক মেয়ে, এক পুত্রবধূ ও চার নাতি মারা গেছে।
নিহতদের একজনের স্বজন আশরাফুল আলম জনি বলেন, “স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, দুই ভাই, বাবা আর বোনকে হারিয়েছি। আমার সব শেষ হয়ে গেছে… আমি একা হয়ে গেলাম।”
কনের বাড়িতেও শোকের মাতম
কনের বাড়ি কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামেও চলছে শোকের মাতম। নববধূ মার্জিয়া আক্তার, তাঁর বোন ও দাদির জানাজা শেষে শুক্রবার সকালে তাদের দাফন করা হয়েছে।
মার্জিয়ার বাবা আবদুস সালাম দুই মেয়ে ও মাকে হারিয়ে শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
যে বাড়িতে কয়েক দিন ধরে বিয়ের আনন্দ-উৎসব চলছিল, সেখানে এখন কেবল কান্না আর নিস্তব্ধতা।
বিয়ের আনন্দযাত্রা শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল এক হৃদয়বিদারক মৃত্যুমিছিল।
