আজ ৫১তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস
বিশেষ প্রতিনিধি: ‘স্বাধীনতা হীনতায়/কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়/ দাসত্ব শৃংখল বল/কে পরাবে পায় হে কে পরাবে পায়’। …‘পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত/ ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে/ নতুন নিশান উড়িয়ে/ দামামা বাজিয়ে দিগি¦দিক/ এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে হে স্বাধীনতা।’
নিত্যদিনের মতো আজও ভোরের সূর্যালোকের বর্ণচ্ছটায় রাঙাবে কৃষ্ণচূড়া, গ্রামীণ পথের শেষে নদীর তীরে অশ্বত্থ শাখা থেকে ভেসে আসবে কোকিলের কুহুতান, শ্যামল প্রান্তরের দূর-দূরান্ত থেকে আজ বাজবে রাখালিয়ার মনকাড়া বাঁশির সুর, নীল আকাশের বুকে ডানা মেলবে উড়ন্ত বলাকার ঝাঁক, কলকাকলিতে মুখরিত হবে জনপদ। তবুও অন্য যে কোন দিনের চেয়ে আজকের দিনটি সম্পূর্ণ আলাদা। ভিন্ন আমেজের, ভিন্ন অনুভূতি ও ভিন্ন স্বাদের আমাদের এই প্রিয় স্বাধীনতা দিবস। জাতীয় জীবনের সবচেয়ে আলোচিত, সবচেয়ে গৌরবের স্মৃতি নিয়ে আবারও ফিরে এসেছে চির অমøান, আনন্দ-বেদনায় মিশ্রিত দিবসটি।
আজ ২৬ মার্চ। রক্ত, অশ্রুস্নাত বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহের দিন। বাঙালীর শৃৃঙ্খলামুক্তির দিন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বাঙালীর দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত লড়াইয়ের সূচনা কাল। বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর দিন আজ। মহার্ঘ্য স্বাধীনতা। কিন্তু বাঙালী জাতিকে এ জন্য দিতে হয়েছে চরম মূল্য।
আজ ৫১তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল একটি ভূখন্ডের, যার নাম বাংলাদেশ। সবুজের জমিনে রক্তিম সূর্যখচিত মানচিত্রের দেশটি ৫১ বছর পূর্ণ করলো আজ।
গত বছর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছরে আরও একটি নতুন পালক যোগ হয় সল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরনের জাতিসংঘের চুড়ান্ত সুপারিশ। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা যোগ্যতা নির্ধারণের তিনটি সূচকের ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিন সূচকেই মান অর্জন করায় এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ পায় বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) সম্প্রতি এ সুপারিশ করে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এটি ছিল একটি বড় অর্জন।
১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বার্ষিক বাজেট আজ পরিণত হয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬ শ ৮১ কোটি টাকার বাজেটে। সেদিনের ১২৯ ডলার মাথাপিছু আয়ের দেশটিতে বর্তমান মাথাপিছু আয় ২৫৯১ ডলার। সময় পেরিয়েছে, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়েছে। মাথাপিছু আয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ব্যবহার এবং সম্পদ উৎপাদন ও আহরণ দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ির’দেশ আখ্যা দেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে দারিদ্র্য আর দুর্যোগের বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পথে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ আর্থসামাজিক প্রতিটি সূচকে এগিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত এবং একটি মর্যাদা সম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই যাতে কেউ আমাদেরকে দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবন দেশ হিসেবে উল্লে¬খ করে অবহেলা করতে না পারে।’
অনেক প্রাপ্তি নিয়ে এবার স্বাধীনতা উদযাপিত হবে। গতবছর এমন একটি সময়ে দিবসটি উদযাপিত হয়েছিল, যখন বাংলাদেশসহ চারদিকে ছিল বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসের থাবা। বর্তমানে মহামারি অনেকটা নিয়ন্ত্রনে। স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে তাই এবার স্বতঃস্ফূর্ততা থাকবে বেশি।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে যশোরসহ জাতীয় পর্যায়ে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মহান স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে যশোরে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। কুচকাওয়াজ, ডিসপ্লে, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সংবর্ধনাসহ নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হবে। কালেক্টরেট চত্বরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা দিবসের সূচনা হবে। আজ সকাল ৬টায় যশোর শহরের মণিহার এলাকায় বিজয়স্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবে জেলা প্রশাসন। সকাল ৮টায় শামসুল হুদা স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন হবে। ৮টা ১৫ মিনিটে স্টেডিয়ামে পুলিশ, আনসার, ভিডিপিসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্কাউটস ও শিশু কিশোরদের অংশগ্রহণে কুচকাওয়াজ ও ডিসপ্লে অনুষ্ঠিত হবে।
সকাল ১০টায় স্টেডিয়ামে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া অনুষ্ঠান। সকাল সাড়ে দশটায় টাউন হল মাঠে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সংবর্ধনা। বিকেল ৩টা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে মহিলাদের খেলাধুলা। বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে শামসুল হুদা স্টেডিয়ামে প্রবীণদের হাঁটা প্রতিযোগিতা। বিকেল চারটায় স্টেডিয়ামে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। যশোর নাদিরা ইসলাম ভলিবল গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা দিবস ভলিবল টুর্নামেন্ট। বিকেল ৫টায় টাউন হল ময়দানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও সুর্বণজয়ন্তীতে দেশের উন্নয়ন’ শীর্ষক আলোচনা।
মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে যশোরের মণিহার চত্বরের বিজয় স্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করবে প্রেসক্লাব, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে), সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। প্রেসক্লাব ও জেইউজে নেতৃবৃন্দ সকাল ১০টায় সকল সদস্যকে এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন।