সাজেদ রহমান: দক্ষিণমুখী দ্বিতল বাড়ির অধিকাংশ ভেঙ্গে পড়েছে। শুধু ইটের পিলারের কিছু অংশ এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে জন্মেছে নানা ধরণের লতা-পাতা। জন্মেছে বট-অশ^থসহ অন্যান্য গাছ। এই বাড়িতে এক সময় বসবাস করতেন প্রভাবশালী জমিদার রত্মেশ^র চৌধুরী ও তাঁর বংশধররা। কিন্তু ৫০ বছরের জমিদারি মাত্র ৬ বছরেই শেষ হয়ে যায়।
যশোর শহর থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে ভৈরব নদের তীরে বিরামপুর গ্রামে গেলে দেখা মেলে এই জমিদার বাড়ি। যতদূর জানা যায়, রাজা কংসনারায়ণের দুই পুত্র রাঘবেন্দ্র রায় চৌধুরী ও রত্মেশ^র রায় চৌধুরী।
রত্মেশ^র ঝিকরগাছার গঙ্গানন্দপুর থেকে যশোর শহরের উপকন্ঠ নওয়াপাড়া(বিরামপুর) এসে বসবাস শুরু করেন। এই অংশ তখন ঈশপপুর পরগণার অন্তর্গত ছিল। ভৈরব নদ এখানে একে বেঁকে চলে গেছে। কবির রঞ্জিত বর্ণনায় দেখা যায়: ‘যথায় বিখ্যাত ঈশপপুর পরগণা, বৃথা চক্ষু তা’র না দেখিল যেই জন। তা’র মধ্যে গ্রামচুড়া নবপাড়া গ্রাম, নবীন কৈলাস যেন দর্শনে সুঠাম। তথায় শ্রীশিবচন্দ্র রায় গুণমণি, প্রশস্ত কায়স্থ-বংশে যিনি চুড়ামণি। যাঁর যশে যশোময় ছিল যশোহর. যেন নবচন্দ্র নবপাড়ার ভিতর।’
রত্মেশ^রের দুই পুত্র রামরাম ও কৃষ্ণরাম। কৃষ্ণরামের বংশধর এই জমিদার বাড়ি ত্যাগ করে পাশে নতুন বাড়ি তৈরি করেছিলেন। কৃষ্ণরামের পৌত্র নিমানন্দ ভূষণার মুন্সেফ ছিলেন, তিনি সেখান থেকে মিস্ত্রি এনে বাড়িতে সুন্দর শিল্পযুক্ত চ-ীম-প প্রস্তুত করেন। যার এখন আর কিছু নেই। জমিদার বাড়ির যে প্রকা- বৈঠকখানা ছিল তা দূর থেকে রাজোচিদ প্রাসাদ বলে মনে হতো। এটা তৈরি করা হয়েছিল রতিকান্তের সময়। সে সময় এই জমিদারদের বার্ষিক আয় ছিল ৫০ হাজার টাকা। যেমন ২৫/৩০টি নীলের কুঠির আয় ছিল, তেমনই মহল কালনা ও হোগলা পরগণা ১১ বছরের জন্য ইজারা ছিল বলে তাদের প্রতিপত্তি এত বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিবচন্দ্রের মধ্যম পুত্র কালীকান্তই সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাপন্ন পুরুষ ছিলেন।
তিনি নলদী পরগণার নায়েব বা সাজোওয়াল ছিলেন। সেই সময় তিনি তরফ নহাটা, মিঠাপুর এবং লাট উজিরপুর এই তিনটি সম্পত্তি নলদীর অধীন পত্তনী নেন। এছাড়াও পরগণার ইমাদপুরের এক চতুর্থাংশ বগচরের আঢ্য জমিদারদের কাছ থেকে কিনে নেন। কিন্তু এই সকল সম্পত্তি যেমন জোয়ারের পানির মত এসেছিল, তেমনই কয়েক বছরের মধ্যে (১২৮৩-৮৮ বাংলা) একেবারে নি:শেষ হয়ে যায়।
তরফ নহাটা নীলকর সেলভি সাহেবের কাছে বিক্রি করা হয়। নড়াইলের শরিক গুরুদাসবাবুর হাটবাড়িয়া লাট উজিরপুরের অন্তর্গত ছিল। গুরুদাসবাবু কালীকান্তের শ্যালী-পুত্র, এজন্য তিনি যখন জ্ঞাতিবিরোধের জন্য পৃথক বাড়ি করতে উদ্যোগী হলেন, তখন তাঁর প্রার্থনামত কালীকান্ত উজিরপর কোবলা করে দেন। বগচরের আনন্দচন্দ্র চৌধুরীর সাথে কালীকান্তের ধর্ম বন্ধুত্ব ছিল। মিঠাপুর নিলাম হবার সময়ে কালীকান্ত তা আনন্দচন্দ্রের বেনামে খরিদ করেন।
কিন্তু আনন্দচন্দ্রের আকস্মিক মৃত্যুর পর বেনামে খরিদ করা সম্পত্তি আর পাননি তিনি। ইমাদপুরের অংশও নিলামে বিক্রি হলে, চাঁচড়ার রাজা খরিদ করেন। এভাবে অল্প দিনের ভেতর বিরামপুরের জমিদারগণ প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন। কবি’র উক্তিতে কালীকান্ত সম্পর্কে ‘যা’র গুণ দিয়া ব্রহ্মা হলেন নির্গুণ’ ইত্যাদি অত্যুক্তি যাই থাকুক, তিনি যে ‘বিশিষ্ট বলিষ্ঠ শিষ্ট’ ইষ্ট-নিষ্ঠ প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাঁর সে বিপুল সৌভাগ্যের সঙ্গে নওয়াপাড়ার(বিরামপুর) রায় চৌধুরীদের দুরবস্থার কথা শুনলে অনেকে অশ্রু সম্বরণ করতে পারেন না। তবে এই বংশের জমিদারি হারালেও শিক্ষাদীক্ষায় তারা বেশ এগিয়ে গিয়েছিলেন।
এরমধ্যে নবকান্তের পুত্র দুর্গাকান্ত সাবজজ হয়েছিলেন, কালীকান্তের পৌত্র নলিনীনাথ ভারত সরকারের অধীন উচ্চ পদে চাকরি করতেন, কালীকান্তের পুত্র কেশবলাল ও তার পুত্র শৌরৗন্দ্রনাথ সাব-রেজিষ্ট্রার এবং রতিœকান্তের পৌত্র মণীন্দ্রলাল যশোর কালেক্টরির সুপারিন্টে-েন্ট হয়েছিলেন।
এই জমিদার বংশের অধিকাংশ এখন ভারতে বসবাস করেন। আর যশোরেও বসবাস করেন কিছু বংশধর। এই বংশের বিমল রায় চৌধুরী ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, মারা যান ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর।