লোড-আনলোড বন্ধ
আহত ১০
পরিবেশ থমথমে
নিজস্ব প্রতিবেদক: বেনাপোল স্থলবন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রণে নিতে সোমবার বিবাদমান দুই গ্রুপের মধ্যে বৃষ্টিরমত বোমাবাজি হয়েছে। দু’জন জনপ্রতিনিধির সমর্থকরা এ ঘটনায় জড়িত। স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন ও বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন দুটি পক্ষকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে থাকেন। উভয় পক্ষের ১০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪ জনকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরা হলেন বেনাপোলের নামাজ গ্রামের জুলফিকার আলী জুলু (৫৫), একই গ্রামের রাব্বি হোসেন (২০), বৃত্তি আঁচড়া গ্রামের ইমরান হোসেন (৪৫) ও খড়িডাঙ্গা গ্রামের সৈকত হোসেন (৪২)। পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বেনাপোলের ছোট আঁচড়া গ্রামের আফসার আলী (৫৮) ও খড়িডাঙ্গা গ্রামের আবুল কালামকে (৪০) আটক করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাবেক বন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক ও বেনাপোল পৌর কাউন্সিলর রাশেদ আলীর নেতৃত্বে বহিরাগত একটি দল সোমবার সকালে বন্দর এলাকায় শতাধিক শক্তিশালী হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় বন্দর শ্রমিকরা বন্দর অভ্যন্তরে লোড-আনলোড করছিল। বোমার শব্দ পেয়ে তারা কাজ বন্ধ করে একজোট হয়ে লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় নেমে এলে বহিরাগতরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়।
এ সময় বন্দরে কর্মরত কাস্টমস, বন্দর, সিএন্ডএফ এজেন্ট, ট্রান্সপোর্ট কর্মচারী ও সাধারণ পথচারীরা আতংকিত হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে। প্রায় ৩ ঘণ্টা বন্ধ থাকে বেনাপোলের সড়ক। প্রাণের ভয়ে বন্দর ও আশেপাশের দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি), নাভারন সার্কেলের এএসপি, শার্শা ও বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন।
এ ঘটনায় আজিজুর রহমান ও আলী হোসেনসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়। আহতরা মেয়রের সমর্থক ও বোমা হামলার সাথে জড়িত সন্দেহে মারপিট করে শ্রমিকরা। আহতদের দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে পুলিশ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো, বেনাপোল পোর্ট থানার খড়িডাঙ্গা গ্রামের আবুল কালাম (৪৮), ছোট আঁচড়া গ্রামের আনসার আলী (৫০)।
বোমা হামলার প্রতিবাদে সকাল ১১টা থেকে বন্দরে আমদানিকৃত পণ্যচালান লোড-আনলোড বন্ধ রেখে শ্রমিকরা বেনাপোল বন্দরসহ বাজারে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ঘটনার বিচার দাবি করেন।
বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা মেয়রের অফিস, মার্কেটে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে। কাস্টমস অফিসের সামনে মেয়রের ৫তলা ভবনের নীচে অবস্থিত আইসিবি ব্যাংকের বুথসহ ভবনের সামনের গ্লাস ভাংচুর করা হয়। এতে ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।
দলীয় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন ও বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। বর্তমানে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমপি সমর্থক বেনাপোল বন্দরের ৯২৫ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রাজু আহম্মেদ এবং সম্পাদক উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সদস্য অহিদুজ্জামান অহিদ। মেয়র গ্রুপের সমর্থিত সাবেক হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক পৌর কাউন্সিলর রাশেদ আলীর লোকজন বোমা হামলা চালিয়ে বন্দরের হ্যান্ডলিং কাজ দখল করতে সোমবার এ ঘটনা ঘটায় বলে বর্তমান শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ।
৯২৫ শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক অহিদুজ্জামান অহিদ জানান, বর্তমানে শ্রমিকরা বন্দরে শান্তির সাথে কাজ করে আসছে। কিন্তু একটি পক্ষ তা ভালভাবে না নিয়ে ষড়যন্ত্র করে বন্দরের পরিবেশ নষ্ট করতে চাইছে। এদিন মেয়র সমর্থিতরা হঠাৎ শ্রমিকদের উপর বোমা হামলা করে। পরে আমরা প্রতিহত করলে সন্ত্রাসীরা পিছু হটে।
নাভারন সার্কেল এএসপি জুয়েল ইমরান জানান, বন্দরে দুটি শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সংবাদ পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আহত অবস্থায় ২জনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বেনাপোল পৌর কমিশনার রাশেদ আলী জড়িত বলে নাম এসেছে। এ ঘটনায় যারাই জড়িত হোক না কেন তাদের আটক করে আইনের আওতায় আনা হবে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে।
বেনাপোল বন্দরের উপ-পরিচালক মামুন কবীর তরফদার জানান, হ্যান্ডলিং শ্রমিকদের সৃষ্ট গোলযোগে বেলা ১১টা থেকে বন্দরে লোড আনলোড কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে বন্দরে জটের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় বন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বন্দরের অভ্যন্তরে পণ্য লোড-আনলোড বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকরা বন্দরের সামনে অবস্থান নিয়েছে। তবে তারা কাজে যোগ দিবে না বলে জানিয়েছে কয়েকজন লেবার সর্দার।
বেনাপোল পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আশরাফুল আলম লিটন জানান, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি অহিদুজ্জামান ৩ বছর আগে বোমাবাজি করে অবৈধভাবে শ্রমিক ইউনিয়ন দখল করে আছে। এরপর তিনি সাধারণ শ্রমিকদের সদস্যপদ থেকে বাদ দিতে শুরু করেন। গতকাল বঞ্চিত শ্রমিকদের গ্রুপ ও অহিদুজ্জামান গ্রুপদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। অথচ সন্ত্রাসীরা আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন এসব সন্ত্রাসী শ্রমিকদের মদদ দিচ্ছেন।
এব্যাপারে সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন দেশের বাইরে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এমপি গ্রুপের রাজনীতি করেন শার্শা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল হক মঞ্জু জানান, মেয়র আশরাফুল আলম লিটনের ক্যাডার কাউন্সিলর রাশেদ আলীর নেতৃত্বে সোমবার সকালে মাইক্রোবাসে এসে শ্রমিকদের পোশাক পরে বন্দরের দখল নিতে বোমবাজি শুরু করে। পরে সাধারণ শ্রমিকরা জোটবেধে তাদেরকে ধাওয়া দিয়ে বের করে দেয়। মেয়র লিটন শান্ত বন্দরটিকে অশান্ত করে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।