তদবির গ্রহণ করা হবে না-আইনশৃঙ্খলা সভায় জেলা প্রশাসক
নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে গত আট দিনে অন্তত ৪০ জনকে গ্রেফতার করে সাজা দেওয়া হয়েছে অথবা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, এই অভিযানে আটক ব্যক্তিদের ছাড়াতে এখন পর্যন্ত কেউ তদবির করেনি এবং প্রশাসনও কোনো তদবির গ্রহণ করবে না।
রোববার যশোর কালেক্টরেটের অমিত্রাক্ষর সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এসব তথ্য জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রশাসন কাজ করছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নির্দেশনাও রয়েছে। তার নির্দেশনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে মাদক সিন্ডিকেট অনেক সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা বা ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হতো। তবে বর্তমান সরকারের কেউ প্রশাসনের কাজে হস্তক্ষেপ না করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়েছে।
সভায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে ভোট চাইতে গিয়ে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের কারণে তারা নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা কথা দিচ্ছি—আমাদের দলের কেউ যদি এসব অপরাধে জড়িত থাকে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিন। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু পুলিশ সদস্যের সঙ্গে মাদক কারবারীদের সখ্যতা রয়েছে, যার কারণে মাদক ব্যবসার বিস্তার ঘটছে। চাঁচড়া ফাঁড়িসহ কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়িতে বিচার-সালিশের নামে মানুষকে হয়রানি করা ও মাদক সিন্ডিকেটকে সহায়তা করার অভিযোগও সভায় উত্থাপন করেন তিনি। এমনকি কোতোয়ালি থানার ওসিকে কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানানো হলেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি বলেও দাবি করেন বিএনপির এই নেতা।
দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের কেউ যদি বিএনপি করতে চান, তবে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসা উচিত। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যেন সুবিধা নিতে না পারে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলমান পরিস্থিতিতেও যশোরে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে জেলা প্রশাসনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং তেল সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং ভারতীয় অস্ত্র পাচারের কয়েকটি ঘটনা ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে।
এছাড়া একটি চক্র ঈদকে সামনে রেখে তেল সংকট তৈরি করে ঘরমুখো যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলতে চায় বলেও সভায় উল্লেখ করা হয়। একইভাবে বাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো এবং ভোজ্য তেলের সংকট তৈরির চেষ্টার অভিযোগও ওঠে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকারিভাবে এসব পণ্যের দাম বাড়েনি এবং সরবরাহেও কোনো ঘাটতি নেই।
সভায় জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পিপি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সোনা বিক্রির নামে প্রতারণার একটি চক্র সক্রিয় হয়েছে। গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মানুষ তাদের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন।
এদিকে শহরের রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে রাখা নির্মাণসামগ্রী, ইট-বালু বা দোকানের মালামালের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক। এসব সামগ্রী জব্দ করে নিলামে বিক্রি করা হবে বলে জানান তিনি। ঈদ উপলক্ষে অস্থায়ী দোকান বসতে দেওয়া হলেও ঈদের পর সেগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শহরের যানজট নিরসনে রাত ১২টার আগে বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান শহরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে শহরে ভাড়ায় চলাচলকারী একাধিক ইজিবাইক ও অটোরিকশার মালিকদের তালিকা করে প্রয়োজন হলে সেগুলো জব্দ করার কথাও জানানো হয়।
সভায় আরও জানানো হয়, ঈদ উপলক্ষে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে রাতে দোকান ও বিপণিবিতান খোলা রাখা যাবে। তবে প্রতিটি বিপণিবিতান ও শপিং মলে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার, সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা, ডিডিএলজিইডি ও পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইরুফা সুলতানা, সেনাবাহিনীর ২ ইস্ট বেঙ্গলের উপ-অধিনায়ক মেজর মাসুদ, ৪৯ বিজিবির উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আসাদ, এনএসআইয়ের যুগ্ম পরিচালক আবু তাহের মো. পারভেজ, যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক তানভীরুল ইসলাম সোহান এবং প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুনসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
