নিজস্ব প্রতিবেদক: রিকশাচালক থেকে গায়ক বনে যাওয়া আকবর আলী চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তার পিতা-মায়ের কবরের পাশে। সোমবার ভোররাতে ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে যশোরে নিয়ে আনা হয় আকবর আলীর মরদেহ। তারকাখ্যাতি পাওয়ার আগে যে স্ট্যার্ন্ডে একটা সময়ে রিকশা নিয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতেন আকবর; সেই স্ট্যান্ডেই যশোর শহরের ধর্মতলা কদমতলা মোড়ে তার দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
এসময় আকবরকে একনজর দেখতে ভিড় করেন একসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রিকশা চালানো সহযোদ্ধা বন্ধুরা। শূন্য থেকে তারকাখ্যাতি, জীবন সায়হ্নে নিঃস্ব হয়ে আকবরের এমন বিদায়ে ব্যথিত করেন তাদের। জানাযা শেষে কারবালা কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এদিকে, আকবরের মৃত্যুতে তার প্রতি কোন শ্রদ্ধা জানাননি ঢাকা ও যশোরের শিল্পী সমাজ। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আকবরের পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্খিরা।
গায়ক আকবর যশোর সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের সুজলপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই স্ত্রী, তিন সন্তানসহ অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী রেখে গেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন। গ্রামে থাকেন তার প্রথম স্ত্রী ও দুই ছেলে।
সোমবার দুপুরে যশোর সদর উপজেলার সুজলপুর গ্রামের গিয়ে দেখা গেছে, আকবরের জীর্ণ বাড়িতে তার প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগম ও দুই ছেলে বসবাস করেন। দুই ছেলে রঙ মিস্ত্রির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর প্রথম স্ত্রী প্যারালাইজড হওয়ায় বেশ কয়েক বছর ধরে অসুস্থ।
আকবর তারকা খ্যাতি পাওয়ার বছর ৫ পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সেই স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। দ্বিতীয় সংসারে তার একটি মেয়েও আছে। দ্বিতীয় বিয়ের পর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের তেমন খোঁজ রাখতেন না।
আকবরের প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, আকবর যখন রিকশা চালাতেন তখন আমি পরের বাসায় কাজ করতাম। আমাদের সংসারে কষ্টের মধ্যেও সুখ ছিল। গায়ক হওয়ার পর ৫ বছর আমরা একসঙ্গে সুখেই ছিলাম। ইত্যাদির হানিফ সংকেত স্যারের কাছে গোপন করে আকবর দ্বিতীয় বিয়ে করে। আর আমাকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। এরপর থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ কমতে থাকে। সর্বশেষ গতবছর গ্রামে এসেছিল।
আকবর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ফোন করে তার সাথে কথা বলতে চাইলে দেয়া হতো না। তিনি আরও বলেন, আকবরের চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু সেই টাকা কিভাবে খরচ হয়েছে আমরা কিছুই জানি না।
আকবরের বোন রিজিয়া বেগম বলেন, আমার ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য অনেকে লাখ লাখ টাকা দিয়েছে। কিন্তু আমার ভাইয়ের চিকিৎসা হয়নি। বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। কয়েক মাস আগে আমি ঢাকাতে আকবরের সঙ্গে দেখা করতে গেলে সে আমাকে বলে, ‘আমারে যশোরে নিয়ে যা, আমি এখানে থাকতে চাই না। এখানে আমার চা খাওয়ার টাকাও নেই।
সোমবার দুপুরে আকবরের গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন দ্বিতীয় স্ত্রী কানিজ ফাতিমা। তিনি গণামধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
যশোর সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহারুল ইসলাম বলেন, আকবর রিকশা চালক ছিলেন। ইত্যাদির মাধ্যমে গায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাকে সবচেয়ে বেশি ভালবেসেছে। মানুষের ভালবাসায় আকবর জনপ্রিয় শিল্প হয়েছে।
তার মাধ্যমে আমাদের ইউনিয়নের মানুষ সম্মানিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘আকবরের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, তারকা হলেই তার অতীত ভুলে গেলে হবে না। আকবর শূন্য থেকে তারকাখ্যাতি হয়েছিলো, জীবন সায়হ্নে নিঃস্ব হয়ে আকবরের এমন বিদায়ে ব্যথিত করেছে আমাদের।
জানা যায়, ২০০৩ সালে যশোর এম এম কলেজের একটি অনুষ্ঠানে গান গাইবার সুযোগ পেয়েছিলেন আকবর। বাগেরহাটের এক ব্যক্তি সেদিন আকবরের গান শুনে মুগ্ধ হন। তিনিই ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে চিঠি লেখেন। আকবরের প্রতিভা সম্পর্কে জানান।
এরপর ‘ইত্যাদি’ কর্তৃপক্ষ আকবরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওই বছর ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে কিশোর কুমারের ‘একদিন পাখি উড়ে যাবে’ গানটি গেয়ে রাতারাতি পরিচিতি পেয়ে যান আকবর।
রোববার দুপুর ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এর আগে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে কয়েক দফায় দেশে ও দেশের বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন আকবর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিৎসার জন্য ২০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন।