আবদুল কাদের: যশোরের ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়া। এর মধ্যে শহরের ৪টি বিদ্যালয় রয়েছে। ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে চালানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠাগুলো। এতে শিক্ষা কার্যক্রমসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম বিঘœ ঘটছে। বছরের পর বছর ধরে এসব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলেও নিয়োগ বা পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও মাউশি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আশা করছি সরকার ঈদের আগে বা পরপরই যেসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে সেখানে পদোন্নতি দিয়ে পূরণ করা হবে।
যশোরের সহকারী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্বাস উদ্দিন জানান, জেলায় মোট ৫২২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষকবিহীন। এসব বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে কার্যক্রম। এতে লেখপড়া ও প্রশাসনিক নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না ভারপ্রাপ্তরা।
যশোর বালিকা বিদ্যালয়ে লাইলা শিরিন সুলতানা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় চলতি মাসে অবসরে গেছেন। তিনি জানান, অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। এতে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাই তিনি সরকারের কাছে সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণের আহ্বান জানান।
যশোর জিলা স্কুলে প্রায় এক বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন শোয়াইব হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৬৫ জন ছাত্র রয়েছে। দুই বিভাগে তাদের পাঠদান করানো হয়। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলেও আমাদের তেমন কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে আশা করছি শিগগিরই এই পদ পূরণ হবে। মণিরামপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হায়দার আলী জানান, গত ৪ বছর ধরে আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের এখানে মোট ২৯৫ জন ছাত্রী ও শিক্ষক আছেন ১৪ জন। লেখাপড়ায় কোন ব্যাঘাত ঘটছে না। শতভাগ পাস করছে ছাত্রীরা। তবে প্রশাসনিক কাজে সমস্যা হয়ে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের আগেই বড় ধরনের সুখবর পেতে চলেছেন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষকরা। প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেতে চলেছেন ২৪৪ জন। এ ছাড়া ১৮ জনকে করা হচ্ছে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। সারা দেশে ৩৫২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪২৩ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক পদোন্নতির উপযুক্ত। কিন্তু প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে ২৪৪টি।
আগামী সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবু বকর ছিদ্দীক ডিপিসির সভাপতি। এর বাইরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ, অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব খালেদা আখতার ডিপিসির সদস্য।
প্রধান শিক্ষক না থাকা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রশাসনিকসহ নানা কাজকর্মে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। পদোন্নতির অপেক্ষায় থেকে অনেকেই অবসরে চলে গেছেন; কেউ বা যাওয়ার অপেক্ষায়। এতে শিক্ষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা।
মাউশির সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক) আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর শিক্ষকরা অবসরে যাচ্ছেন। কিন্তু এসব শূন্য পদ পূরণ করতে কিছুটা সময় লাগছে। কারণ, নিয়োগবিধি অনুসারে ফিডার পদ পূর্ণ হলে তবেই পদোন্নতি দেয়া যায়। তবে সরকার চাইলে প্রমার্জন করেও পদোন্নতি দিতে পারে। এবার দুই বছর প্রমার্জন করায় একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো।
জানা গেছে, ভয়াবহ প্রধান শিক্ষক সংকট দেখা দেয়ায় সরকার ফিডার পদ দুই বছর প্রমার্জন করে এসব শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে। পদোন্নতির পর এই শিক্ষকরা পদে যোগ দিলে প্রধান শিক্ষক পদের সংকট প্রায় পুরোটাই কেটে যাবে।
পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা সহকারী প্রধান শিক্ষকরা জানান, এ মুহূর্তে ২৪৪টি প্রধান শিক্ষক পদ ফাঁকা থাকলেও সবকটি এখনই পূরণ হবে না। কারণ, নিয়োগবিধি অনুসারে মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। বাকি ২০ শতাংশ পদে সরাসরি নিয়োগ হবে। এবার পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার নিয়ম দুই বছর কমিয়ে প্রমার্জন করে পদোন্নতি দিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
যশোর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম আযম বলেন, জেলায় আগে ৪টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল। সম্প্রতি সরকার আরও ৬টি বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছে। বর্তমানে জেলায় কোন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। ভারপ্রাপ্ত দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে শিক্ষাসহ প্রশাসনিক কার্যক্রমে সংকট তৈরি হচ্ছে। আবার অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কথা অন্য শিক্ষকরা শুনতে চাইনা। তিনি বলেন, পদোন্নতি পেতে পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা লাগত। এটি শিথিল করতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে রাষ্ট্রপতির দপ্তর হয়ে দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রমার্জন করা হয়েছে। পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে। সর্বশেষ বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির বৈঠকের পর গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর পদোন্নতি ঘোষণার কথা ছিল। আশা করছি চলতি মাসে এসব সংকট দূর হয়ে যাবে।
এ ব্যাপারে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান হাবীর জানান, একটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে অনেক ধরণের জটিলতা হয়ে থাকে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। এতে শিক্ষাসহ প্রশাসনিক কাজে ব্যাঘাত ঘটে। কেননা মাধ্যমিকের ভীত মজবুত না হলে শিক্ষার্থী তার প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। এজন্য দ্রুত সব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
যশোর সরকারি এমএম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মর্জিনা আক্তার জানান, একটি প্রতিষ্ঠানে প্রধান না থাকলে সেই প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চলতে পারেনা। শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি হয়। এতে শিক্ষাকার্যক্রম দারুণভাবে বিঘœ ঘটে।
পদোন্নতির বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক বেলাল হোসাইন বলেন, পদোন্নতির ডিপিসি আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে পারে। আশা করা যাচ্ছে, ঈদের আগেই প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।