সালমান হাসান
যশোরে আছড়ে পড়েছে করোনার নতুন ধরণ ওমিক্রন ঢেউ। ফলে ভাইরাস সংক্রমণ আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে। শনিবার ৩৫ জনের দেহে অতিসংক্রমণশীল এই ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া জেলায় গতদিন ১৯৪ জনের শরীরে করোনার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো ডেল্টার চেয়ে চারগুণ শক্তিশালী ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টটির স্যোশ্যাল ট্রান্সমিশন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমিক্রন আক্রান্তরা স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছেন। জেলায় ভাইরাসটির এখন সামাজিক সংক্রমণ চলছে। স্থানীয়ভাবে ওমিক্রণ ছড়াচ্ছে।
অনুজীব বিজ্ঞানী এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষক ড. ইকবাল কবীর জাহিদ জানান, ওমিক্রনের সংক্রমণ ছড়ানোর সক্ষমতা অনেক বেশি। এটার শক্তি ডেল্টার ৪ গুণ। অতিসংক্রমণশীল হওয়া এটি ছড়ায়ও দ্রুত। তিনি আরও জানান, এ পর্যন্ত ৩৮ জনের শরীরে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে, তাদের সবাই স্থানীয়ভাবে ভাইরাসটি থেকে সংক্রমিত হয়েছেন। যশোরে ধরণটির স্যোশ্যাল ট্রান্সমিশন (সামাজিক বা গোষ্ঠী) চলছে। ফলে সংক্রমণ বড় আকার ধারণ করবে বলে মনে করেন-যবিপ্রবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও জিনোম সেন্টারের এই সহযোগী পরিচালক।
যশোর সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, শনিবার ল্যাবরেটরিতে আরটি-পিসিআর টেস্টে ২৬৬ নমুনায় ১০৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। র্যাপিড এ্যান্টিজেন টেস্টে ১৪০ নমুনায় ৮৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়। টেস্ট বিবেচনায় শনাক্তের হার ৪৭ শতাংশ। এদিকে যশোরের মত খুলনা বিভাগ জুড়ে করোনা পরিস্থিতি মোড় নিচ্ছে খারাপের দিকে। গতকাল বিভাগে প্রায় ৫০০ মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ১ হাজার ৪১১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৪৮৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় বিভাগে শনাক্তের হার এদিন ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। আগের দিন শনাক্তের হার ছিল ২২ দশমিক ৫১ শতাংশ।
সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার রেহেনেওয়াজ জানান, আট উপজেলায় করোনার রোগিদের জন্য ১৪০টি বেডের সংস্থান আছে। এছাড়া জেনারেল হাসপাতালে আছে ১২৭টি।
যবিপ্রবি সূত্র বলছে, ওমিক্রন শনাক্ত ৩৫ জনের গুরুতর কোন উপসর্গ নেই। উপসর্গ বলতে ঠান্ডাজনিত সমস্যা-হালকা জ¦র, গলা ও মাংস পেশিতে ব্যথা আছে। রোববার যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক করোনার নতুন এ ধরন শনাক্তের বিষয়টি প্রকাশ করেন। সূত্র মতে, গবেষক দলটি গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪১ জনের (২৬ জন পুরুষ ও ১৫ জন নারী) নমুনার স্যাঙ্গার সিকুয়েন্সিং করে ৩৫ জনের প্রাথমিকভাবে ওমিক্রন শনাক্ত করে। বাকিগুলো ডেল্টা ধরন বলে শনাক্ত হয়েছে। গত ১২ জানুয়ারি জিনোম সেন্টারে তিন জনের নমুনার পূর্ণাঙ্গ জীবন রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে ওমিক্রন শনাক্ত করা হয়। এ নিয়ে যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারে মোট ৩৮ জনের শরীরে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে। এর আগে যশোরে প্রথমবার ৩ জনের দেহে ওমিক্রণ শনাক্ত হয়।
যবিপ্রবির জিনোম সেন্টার থেকে জানানো হয়, জিনোম সেন্টারে ৩৮ জনের নমুনার মধ্যে পূর্বেই তিনটি নমুনার পূর্ণাঙ্গ জীবন রহস্য (হোল জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করা হয়েছিল। বাকি ৩৫ জনের স্পাইক প্রোটিনের স্যাঙ্গার সিকুয়েন্সিং-এর মাধ্যমে ১২ থেকে ১৩টি মিউটেশনের ওপর ভিত্তি করে ওমিক্রন শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বয়স ২০ থেকে ৭১ বছরের মধ্যে। যবিপ্রবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও জিনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর জাহিদের নেতৃত্বে করোনার নতুন এ ধরন শনাক্ত করা হয়। তিনি বলেন, যদিও শনাক্তের বিচারে আক্রান্তদের এখনো গুরুতর উপসর্গ নেই। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে উদ্বেগের ধরন বলে আখ্যায়িত করেছে।
তবে এই উদ্বেগের ধরণে নিয়ে যশোরের মানুষের মধ্যে তেমন উদ্বেগ-উৎকন্ঠা নেই। সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের জারিকৃত ছয়দফা নির্দেশনার বাস্তবায়নও নেই। ১০০ জনের বেশি মানুষের সমাগমের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কোচিং সেন্টারে শত শত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। গণপরিবহনের স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। নিত্যপণ্যের বাজার ও মার্কেটেও বহু মানুষের সমাগমে মাস্ক পরছেন না অনেকে। অথচ নতুন জারি করা নির্দেশনায় এগুলো মেনে চলতে বলা হয়েছে। আর এই নির্দেশনা প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা তার তদারকি স্থানীয় প্রশাসন করবে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে যশোরে দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের তদারকির দৃশ্য সেভাবে চোখে পড়ছে না। উদাসীন বক্তব্যও দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। স্কুল বন্ধ থাকলেও রেডজোনে কোচিং চললেও বন্ধ করা হচ্ছে না। উল্টো বন্ধের ব্যাপারে জানতে চাইলে ‘যখন দরকার হবে তখন বন্ধ করা হবে’-এমনও বক্তব্য দিয়েছেন যশোরের অতিরিক্ত (জেলা প্রশাসক শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন।
যশোরের সিভিল সার্জন বিপ্লব কান্তি বিশ^াস, জানান আক্রান্তদের হোম আইসোলেশনে থাকতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিভাগ থেকে আক্রান্তদের পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। সংক্রমিতদের কেউই গুরুতর অসুস্থ্য নয়। হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে না। তিনি জানান, আজ জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সাথে বৈঠক আছে। সংক্রমণ ঠেকাতে বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
করোনার নতুন ধরণ শনাক্তের বিষয়ে যবিপ্রবির উপাচার্য ও জিনোম সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ওমিক্রন খুবই দ্রুত সংক্রমণশীল। এ কারণে যশোর অঞ্চলে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ৩০ শতাংশের অধিক নমুনা পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে। এজন্য সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের পাশাপাশি টিকা গ্রহণ, মাস্ক ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।