যশোর জেনারেল হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৪৩১ জন
আব্দুর রউফ
যশোর শহর ও শহরতলিতে বাড়ছে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব। সড়ক, বাজার, আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দলবদ্ধভাবে ঘুরছে কুকুর। পথচারী দেখলেই ধাওয়া করা, হঠাৎ কামড়ে দেওয়া কিংবা শিশুদের পিছু নেওয়ার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দলবদ্ধ কুকুরের বেপরোয়া চলাচলে আতঙ্কে থাকেন পথচারী, শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্করা।
কুকুরের পাশাপাশি ঘরে শখ করে পোষা ও বেওয়ারিশ বিড়ালের আঁচড়-কামড়েও বিপুলসংখ্যক মানুষ জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসছেন। যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত সেপ্টেম্বর মাসে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে ৮৫৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে বিড়ালের আঁচড় ও কামড়ে আক্রান্ত হয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ হাজার ৪৩১ জন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের এই বিপুল সংখ্যা যশোরে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা জানা গেলেও শহর ও শহরতলিতে বেওয়ারিশ কুকুরের মোট সংখ্যা কত—তার নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। প্রাণিসম্পদ বিভাগ কিংবা পৌরসভার কাছেও নেই হালনাগাদ তথ্য।
ফলে কোন এলাকায় কুকুরের ঘনত্ব বেশি, কোথায় আক্রমণের ঘটনা বেশি, কতটি কুকুর টিকার আওতায় এসেছে কিংবা কোথায় নতুন করে টিকাদান প্রয়োজন—এসব বিষয়ে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যই নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে।
কুকুর ও বিড়ালের কামড়-আঁচড়ে আক্রান্ত মানুষ প্রতিদিনই যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে আসছেন। ঝুঁকি বিবেচনায় আক্রান্তদের এআরভি (অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন) এবং প্রয়োজন হলে আরআইজি (র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন) দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের টিকা ইনচার্জ নুরুল হক বলেন, কুকুর বা বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়কে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। আক্রান্ত স্থান দ্রুত সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
তিনি বলেন, আক্রমণের ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনা করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে এআরভি এবং প্রয়োজন হলে আরআইজি দেওয়া হয়। জলাতঙ্ক মারাত্মক রোগ হওয়ায় আক্রান্ত প্রাণীর লালা ক্ষতস্থানে লাগলে দ্রুত প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
নিয়ন্ত্রণে নেই দৃশ্যমান কার্যক্রম :
শহরের মাইকপট্টি, ষষ্ঠীতলা, বেজপাড়া ও কাজীপাড়ার কয়েকজন নাইটগার্ডের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের বিচরণ বেড়েছে। দিনের বেলায় দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা করলেও সন্ধ্যার পর সড়কগুলোতে তাদের উপস্থিতি আরও বেশি দেখা যায়। এতে পথচারীদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দলবদ্ধ কুকুর ঘোরাফেরা করায় অনেক শিশুকে একা চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কুকুর তাড়া করলে শিশুরা দৌড়ে পালাতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতেও পড়ছে।
একাধিক বাসিন্দা জানান, আগে কোনো এলাকায় কুকুরের উপদ্রব বাড়লে স্থানীয়ভাবে পৌরসভাকে জানানো হতো। কিন্তু বর্তমানে অভিযোগ জানানোর পরও দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না। ফলে একই এলাকায় কুকুরের সংখ্যা ও আক্রমণের ঘটনা বাড়তেই থাকে।
যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুণ্ডু বলেন, কয়েক মাস আগে যশোর পৌরসভার উদ্যোগে শতাধিক বেওয়ারিশ কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়েছিল। টিকা দেওয়ার পর কুকুরগুলোর শরীরে লাল চিহ্ন দেওয়া হয়, যাতে টিকাপ্রাপ্ত কুকুর শনাক্ত করা যায়।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপর টিকা দেওয়া কুকুরগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, নতুন কুকুরের টিকাদান কিংবা পুনরায় টিকার প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ে ধারাবাহিক কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
ফলে টিকা দেওয়া কুকুরগুলো বর্তমানে কতটা সুরক্ষিত, শহরের মোট কতটি কুকুর টিকার আওতায় এসেছে এবং নতুন করে কতটি কুকুর এলাকায় যুক্ত হয়েছে এসব তথ্যও অজানা।
কুকুরের কামড়ের পর আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি জলাতঙ্কের উৎস নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা। শুধু হাসপাতালে এআরভি ও আরআইজি সরবরাহ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তাদের মতে, প্রথমে যশোর শহর ও শহরতলিতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিরূপণ করতে হবে। এরপর এলাকাভিত্তিকভাবে কুকুরের ঘনত্ব, আক্রমণের ঘটনা, টিকাপ্রাপ্ত কুকুরের সংখ্যা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে একটি নিয়মিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তথ্যও এলাকাভিত্তিকভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। এতে কোন এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ তা চিহ্নিত করে সেখানে টিকাদান, জনসচেতনতা ও প্রাণী ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম জোরদার করা সম্ভব হবে।
