কল্যাণ ডেস্ক
দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনের হাওয়া। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই যেন শুরু হয়েছে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। ভোটের মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াতে চলছে সংঘাত ও সহিংসতা। আর এ কারণে বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিভিন্ন দল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে স্থানীয় পর্যায়ে অস্ত্রের মজুদ তৈরি করছে। একই সঙ্গে চেষ্টা চলছে রাজধানী ঢাকায়ও বড় ধরনের অস্ত্রের চালান ঢোকানোর। ধারণা করা হচ্ছে, ভোটের মাঠ দখলে রাখতে এসব অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে দেশের অস্ত্র চোরাচালানের রুট চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর বিজিবির পক্ষ থেকে সব সীমান্তে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলার এসপিরাও তাদের গোয়েন্দা ইউনিটকে আরও সজাগ করেছে। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের চালান যেন রাজধানীতে না ঢোকে, সেজন্য কাজ করছেন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। যদিও ঢাকায় আগেই কিছু অস্ত্রের চালান চলে এসেছে বলে ওই প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে এবং তা উদ্ধারে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হলে এখন থেকেই সার্বিক বিবেচনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘অস্ত্রের অনুপ্রবেশ সবসময়ই কম-বেশি ঘটে থাকে। সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেমন ‘পুশইন’ ঘটছে, তেমনি অস্ত্রের চোরাচালানও বাড়ছে। নির্বাচন সামনে রেখে এর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। সামনে নাশকতার ঘটনাও বাড়তে পারে। কারণ দেশকে অকার্যকর করা এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা ও যড়যন্ত্রও তো চলছে। এসবের পেছনে একটা বিশেষ মহল কাজ করছে।’
অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে; কিন্ত যেমন এর পূর্বপ্রস্তুতি, তেমনি পরবর্তী প্রস্তুতিও থাকা দরকার। অথচ গোয়েন্দা তৎপরতা, বিশেষ কোনো তৎপরতা আমরা দেখছি না। পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হলে এখন থেকেই সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা মনে করি, চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারে।’
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র্যাব সদা তৎপর
জানতে চাইলে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক, উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র্যাব সবসময় তৎপর ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখলেও সেটা বোঝা যাবে। সারা দেশে র্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন অস্ত্র উদ্ধার করেছে। গত বুধবার রাতে রাউজানে যেখানে গোলাগুলি হয়েছে, ওখান থেকেই গত সপ্তাহে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করেছে র্যাব-৭-এর সদস্যরা। আমাদের কাছে কোনো তথ্য এলে সঙ্গে সঙ্গে তা আমলে নিয়ে যাচাই-বাছাই করে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাই। আমরা সফলও হচ্ছি।’
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, ‘কিন্তু সবসময় তো সব তথ্য আমাদের কাছে আসে না। অনেক সময় সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সব অপারেশনও সফল হয় না। সবদিক বিচার-বিবেচনা করে বলতে পারি, অবৈধ অস্ত্র, চুরি হওয়া, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে র্যাব সবসময় সচেষ্ট ছিল এবং এখনও আছে। আমাদের এই তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘বর্ডার থেকে আট কিলোমিটার পর্যন্ত যেখানে বিজিবির এখতিয়ার রয়েছে, বিজিবির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেখানকার পুরো এলাকায় আমরা নজরদারি রেখেছি। দেশের বর্ডার এলাকায় পুরোপুরি নজরদারি চলছে। যে বর্ডার এলাকা অস্ত্র চোরাচালানের জন্য বেশি আলোচিত, সেখানে আমাদের ব্যাটালিয়নগুলোর ওপরও ২৪ ঘণ্টা নজরদারির বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া আছে। মাঝেমধ্যে নৌপথে, বিভিন্ন মাধ্যমে এবং মানব পাচারের আড়ালেও পাচারকারীরা অস্ত্র নিয়ে আসছে। এ বিষয়েও আমরা দৃষ্টি রাখছি।’
অপচেষ্টা চলছে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে অপচেষ্টা চলছে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করার। সম্প্রতি একাধিক হত্যাকাণ্ডে ক্ষুদ্র অস্ত্রের ব্যবহার ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের। এসব অস্ত্রের উৎস খুঁজতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, অস্ত্র আসছে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫১টি গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার করতে না পারার উৎকণ্ঠা। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, এসব লুণ্ঠিত অস্ত্রের বেশিরভাগেরই আকার পাল্টে ফেলে সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন ঘিরে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অস্ত্রের চালান রোধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসহ দেশের প্রতিটি সীমান্ত এলাকায় বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সম্প্রতি ঘটেছে একাধিক সহিংস ঘটনা
গত বুধবার বিকালে গণসংযোগকালে চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। সেই সময় তার সঙ্গে গণসংযোগে থাকা বিএনপিকর্মী সরোয়ার বাবলাও গুলিতে নিহত হন। ৮ জন অস্ত্রধারী এই কিলিং মিশনে অংশ নিয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। সরোয়ার হত্যাকাণ্ডে ক্ষুদ্র অস্ত্রের ব্যবহারও নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহত সরোয়ার বাবলার ঘাড়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করায় তার মৃত্যু হয় বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। লিস্টেড সন্ত্রাসী বাবর চট্টগ্রামে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গত ৩১ অক্টোবর রাতে বিজিবির সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) একটি দল সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সীমান্তবর্তী ছনবাড়ী বাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে বালুর স্তূপের নিচ থেকে ১টি বিদেশি রিভলবার, ২৫০ গ্রাম ওজনের উচ্চক্ষমতা-সম্পন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য এবং ২টি ডেটোনেটর উদ্ধার করে।
জানতে চাইলে সিলেট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নাজমুল হক বলেন, ‘দেশে বিদ্যমান স্থিতিশীল পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার জন্য চোরাচালানের মাধ্যমে এই অস্ত্র বাংলাদেশে আনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও বিজিবি এ ধরনের অপতৎপরতা রোধে সচেষ্ট থাকবে।’
বর্তমানে চোরাচালানিরা নৌপথকে বেশি নিরাপদ ভাবছে
বিজিবির ওই অস্ত্র উদ্ধারের একই দিন রাতে নরসিংদীর রায়পুরার চরাঞ্চল থেকে ১১টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। সীমান্তবর্তী পাশের ভূখণ্ড থেকে এই অস্ত্রগুলো নদীপথে আনা হয়।
র্যাব-১১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন জানান, এসব অবৈধ অস্ত্র পাশের দেশ থেকে সীমান্ত দিয়ে নদীপথে এসেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর পাহাড়ি এলাকায় কিছু কারিগর রয়েছে। সেখান থেকেও অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করা হয়। কখনও কখনও সেখান থেকে কারিগর নিয়ে এসেও এখানে এগুলো বানানো হতো। তিনি বলেন, ‘অস্ত্র যদি দুষ্কৃতকারীর কাছে থাকে, তারা তা বিভিন্ন অরাজকতা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করতেই পারে। এর মধ্যে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব বলেনÑ এসবেও কাজে লাগানো হতে পারে। এজন্যই আমরা অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করছি, অভিযান চলমান রয়েছে।’
অস্ত্র চোরাচালানের রুট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক গ্রুপ আছে। আবার বর্ডারকেন্দ্রিকও কিছু গ্রুপ থাকে। তারা অস্ত্র সংগ্রহের পর বিভিন্ন পন্থায় দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমান তারা নৌপথটাকে নিরাপদ ভাবছে। কারণ এখানে নজরদারি কম। বর্তমান অস্ত্র চোরাচালানে এই রুট বেশি ব্যবহার হচ্ছে।
গত ২৬ অক্টোবর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে গোয়েন্দা সংস্থা ও রেলওয়ে পুলিশের সহায়তায় রাজধানীর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি নির্দিষ্ট বগি তল্লাশি করে ৮টি বিদেশি পিস্তল, ১৬টি ম্যাগাজিন, ২৬ রাউন্ড অ্যামুনিশন, ২.৩৯ কেজি গানপাউডার এবং ২.২৩ কেজি প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে রেলপুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সন্দেহভাজন হিসেবে ৪ জনকে আনা হলেও তাদের চোরাচালানে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, চাঁপাই সীমান্ত থেকে অস্ত্র সংগ্রহের পর তা ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় চোরাকারবারিরা কাটআউট পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ কারণে তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা না গেলেও বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজে সন্দেহভাজন হিসেবে কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে ঢাকায় কোনো এক গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্রগুলো পৌঁছানোর কথা ছিল।
অস্ত্র আসছে ১০ জেলার ১৮ রুট দিয়ে
অবৈধ অস্ত্রের বেশি চাহিদা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। বিভিন্ন উপায়ে রাজধানীতেও তা পাঠানো হচ্ছে। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের তালিকায় রয়েছে পুরনো মাফিয়া সিন্ডিকেট। সীমান্তকেন্দ্রিক এসব মাফিয়া সব সরকারের আমলেই সক্রিয় থাকে। দেশের ১০ জেলার ১৮টি রুটে এসব অস্ত্র প্রবেশ করছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের সময় আমাদের দেশে সহিংসতা হয়। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই আমরা সারা দেশে অস্ত্র উদ্ধার থেকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছি। সামনে সহিংসতা হতে পারে এ আশঙ্কা ধরে নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
