একরাম-উদ-দ্দৌলা সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রায় অর্ধ শতাব্দিকালের বেশি সময় সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত আছেন দৈনিক কল্যাণ সম্পাদক ও প্রকাশক একরাম-উদ-দ্দৌলা । তিনি ১৯৫২ সালের ৮ এপ্রিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া থানার কলিঙ্গা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মোকসেদ আলী এবং মায়ের নাম আয়শা খাতুন । তিনি মা-বাবার পুত্র সন্তানদের মধ্যে পঞ্চম। শিমুলিয়া গ্রামের স্কুলে তার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯৬৪ সালে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যশোর শহরে । ভর্তি হন শহরের মুসলিম একাডেমিতে। আর্থিক সংকটের কারণে ওই সময় স্কুলের মাসিক বেতন দেয়ার সামর্থ ছিল না। এ কারণে তিনি স্কুল বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিলেও তার ফল প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়। এ অবস্থায় ওই স্কুল ছেড়ে তিনি ভর্তি হন নিউ মডেল একাডেমিতে। সেখানেও একই অবস্থা। এত বাধা সত্বেও তার লেখাপড়া অদম্য স্পৃহায় স্তমিত হয় না। তিনি লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করতে আয়ের পথ খুঁজতে থাকেন।
১৯৬৭ সালে কম্পোজিটর হিসেবে কাজ নেন যশোর শহরের পূর্বাচল প্রেসে। কিন্তু বেতন খুবই কম। শুরুতে মাসিক মাত্র ১৫ টাকা। ওই সময় যশোর সেবাসংঘ বালিকা বিদ্যালয়ে চালু করা হয় নৈশ বিদ্যালয়। তিনি ওই নৈশ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু অল্প দিন পর সেখান থেকে নৈশ বিদ্যালয় তুলে দেয়া হয়। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষাকরা হতোদ্যম না হয়ে তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাঁশ ও নগদ অর্থ তুলে শহরের ঘোপে হাজী মাহমুদুর রহমানের দেয়া জমিতে স্থাপন করেন গোলপাতার নৈশ বিদ্যালয়। সারা দিন কম্পোজিটরের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে হাজির হন নৈশ বিদ্যালয়ে। সেখানে রাত ১০টা পর্যন্ত ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরা। নতুন স্কুল, শিক্ষা বোর্ডের মঞ্জুরী নেই। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ এসএসসি পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা করে নতুন খয়েরতলা হাইস্কুল থেকে । ১৯৭০ সালে ওই স্কুলের মাধ্যমে এসএসসি পরীক্ষায় ২য় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এত কর্মব্যস্ততার মাঝে রাজনীতিবিদ শহীদ মোশাররফ হোসেন এলএলবি এবং ছাত্রনেতা আলী হোসেন মনির সহচার্যে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে । ১৯৬৯ সালে ইনাইটেড প্রেসে ভোটার লিস্ট করার মধ্য দিয়ে কম্পোজিটর জীবনের অবসান হয়। ওই সময় সাপ্তাহিক গণদাবি ও মাসিক মুকুল সম্পাদক কবি নাসিরউদ্দিন আহমেদের সহচার্যে গিয়ে তিনি সাংবাদিকতা জগতে প্রবেশ করেন। এরই মধ্যে ভর্তি হন যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে। চলতে থাকে সাংবাদিকতা, শিক্ষা ও ছাত্র রাজনীতি । মুক্তিযুদ্ধের প্রাক প্রস্তুতি হিসেবে ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াসে যোগ দেন । দেশের স্বাধীনতার জন্য গোপনে প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত করার কাজে লিপ্ত হন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে ছাত্ররাজনীতি ও সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে দেশ পুনঃগঠনের কাজে অংশ নেন। ‘জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ’ বলে যে কথাটি চালু আছে একরাম-উদ-দ্দৌলা সাংবাদিকতা জীবনে তাই করেছেন। ছাত্র জীবনে কম্পোজিটরের কাজ করেছেন । সেই কম্পোজিটর এখন একটি দৈনিক পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক। নিষ্ঠা এবং একাগ্রহতা ছিল বলেই তিনি আজ এ পর্যায়ে উঠতে পেরেছেন । এ কথাটি তিনি গর্বের সাথে স্বীকার করেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা থেকে দৈনিক গণকন্ঠ প্রকাশিত হলে ওই পত্রিকার তিনি দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব পান। ১৯৭৩ সালে রাজনৈতিক গুরু মোশাররফ হোসেন তাঁর নিজ বাড়িতে আততায়ীর গুলীতে নিহত হলে তাঁর রক্ত ছুয়ে শপথ নিয়েছিলেন রাজনীতি না করার। সে সিদ্ধান্ত আজো বহাল আছে। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে সাংবাদিকতা চলতে থাকে তার। এরই মধ্যে ওই কলেজ থেকে এইচএসসি ও বিএ পাস করেন। গণকন্ঠের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দৈনিক সংবাদের যশোর প্রতিনিধির দায়িত্ব নেন। পরে সংবাদ ছেড়ে যোগ দেন যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক ঠিকানার বার্তা সম্পাদক পদে। পরবর্তীতে গণকন্ঠ পুণঃপ্রকাশিত হলে তিনি ঠিকানা ছেড়ে গণকণ্ঠের মফস্বল বার্তা সম্পাদক পদে যোগ দেন। এরপর এই পত্রিকা ছেড়ে যোগ দেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সত্যকথার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক পদে। পরে দৈনিক ঠিকানা সম্পাদক আবুল হোসেন মীরের অনুরোধে তিনি সত্যকথা ছেড়ে ঠিকানার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এই পত্রিকায় কর্মরত অবস্থায় একরাম-উদ-দ্দৌলা ১৯৮৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যশোর থেকে দৈনিক কল্যাণ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাটি যখন প্রকাশ হয় তখন আঞ্চলিক পত্রিকার পাঠক ছিল না । ওই সময় পত্রিকা প্রকাশকরা নিউজপ্রিন্টের কোটা পেতেন। ওই নিউজপ্রিন্ট খোলা বাজারে বেচে দেয়া লাভজনক ছিল। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এই লাভের আশায় এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের ভরসায় অনেকে আঞ্চলিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এই যখন অবস্থা তখন একরাম-উদ-দ্দৌলা একটি পাঠক নির্ভর পত্রিকা প্রকাশের দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন। বলতে দ্বিধা নেই, আঞ্চলিক পত্রিকা বিক্রি করে টাকা ঘরে আনা শেখালো দৈনিক কল্যাণ। পাঠকপ্রিয়তা পাবার একটি অন্যতম কারণ হলো বস্তুনিষ্ঠতা। দৈনিক কল্যাণে হলুদ সাংবাদিকতা প্রশ্রয় পায়নি কোনো দিন। স্থানীয় একটি বহুল প্রচলিত দৈনিকের প্রকাশক যিনি দেশের একজন শীর্ষ রাজনীতিক, তিনি তার কোনো খবর নিজের পত্রিকায় প্রকাশের চেয়ে দৈনিক কল্যাণে প্রকাশে আগ্রহী ছিলেন বেশি । তিনি বলতেন দৈনিক কল্যাণে খবরটি প্রকাশ হলে বিশ^াসযোগ্যতা পাবে। এটা সম্ভব হয় বস্তুনিষ্ঠতার গুণে। অনেকে নিরপেক্ষতার বুলি আউড়িয়ে সব মহলে গ্রহণযোগ্য হয়ে নন্দিত হতে চান। দৈনিক কল্যাণ নিরপেক্ষতার ওই ভুয়া বুলিতে বিশ^াসী নয় । স্বাধীনতার পক্ষে তার অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধে আদর্শ সমুন্নত রাখার অবিচল সংগ্রামে ক্লান্ত নয় । চলার পথে বহু উত্থান পতন ও ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি বস্তুনিষ্ঠতাকে অবলম্বন করে পত্রিকাটি টিকিয়ে রেখেছেন। একরাম – উদ – দ্দৌলা শত কষ্টের মধ্যে সারাজীবন সৎ সাংবাদিকতা করে এসেছেন । জনকল্যাণে তার ত্যাগও অপরিসীম। হাতের মুঠোয় পেয়েও জনস্বার্থে তিনি ভোগ না করে ত্যাগ করে এক অনন্যা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এখানে একটি ঘটনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দৈনিক কল্যাণ প্রকাশের জন্য ডিক্লারেশন পাওয়ার পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবদুল আউয়াল স্বপ্রণোদিত হয়ে পত্রিকাটির নিজস্ব ভবনের জন্য যশোর শহরের চারখাম্বা মোড়ের একটি অর্পিত সম্পত্তির বরাদ্দ দিতে চান। এবং তিনি একরাম-রাম-দ্দৌলাকে তার অফিস এ ডেকে বরাদ্দ প্রাপ্তির জন্য আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করতে বলেন। কিন্তু কল্যাণ সম্পাদক ওই সম্পত্তিতে যশোর নৈশ বিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দের মাধ্যমে বিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব দেন। এবং তিনি তারই অন্যতম হিতাকাঙ্ক্ষী জেলা প্রশাসককে বলেন নৈশ বিদ্যালয় যদি না থাকতো তা হলে আমার জীবন হয়তো অন্যভাবে চলতো। আজ আপনার সামনে আসার যোগ্যতা হতো না। আজ যদি আমার নামে বরাদ্দ হয় তাহলে নৈশ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে আমি যেমন শিক্ষার আলো পেয়েছি এই প্রজন্মের অনেকে সেই যুযোগ বঞ্চিত হবে । এ কথা শুনে জেলা প্রশাসক আবদুল আউয়াল কল্যাণ সম্পাদক একরাম-উদ-দ্দৌলার দিকে প্রায় ১০ মিনিট নিষ্পলক চেয়ে থাকেন। এক পর্যায়ে তার চোখ বেয়ে দড়দড়িয়ে পানি পড়তে থাকে। তিনি ভেবে বিষ্মিত হন মানুষ এমন নির্মোহ হতে পারে। ওই সময় একরাম-উদ-দ্দৌলাও কেঁদেছিলেন । ওই জমিটি পরবর্তীতে নৈশ বিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ হয়। সেটি এখন যশোর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নামে চালু রয়েছে । তিনি যশোর প্রেসক্লাবের ২০১০-২০১২ মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ক্লাবের ৫০ বছরের জীর্ণদশা পাল্টে দেন। অভুতপূর্ব উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। দেশের আধুনিক প্রেসক্লাব হিসেবে দৃষ্টি নন্দন উন্নয়নে সাংবাদিক সমাজসহ যশোরবাসী কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে একরাম-উদ-দ্দৌলাকে। তার মেয়াদ কালে ক্লাবের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। প্রেসক্লাবকে করে তোলেন দৃষ্টিনন্দন। সাংবাদিকতায় একাধিক পুরুস্কার পেয়েছেন । তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৃঢ়চেতা মানুষটি শুধু সাংবাদিকতা জগতেই নয় যশোরের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে রয়েছে তার সরব পদচারনা। অভিনয় করেছেন বহু নাটকে। দায়িত্ব পালন করেছেন যশোর ইনস্টিটিউট নাট্যকলা সংসদের নাট্য-সম্পাদক হিসেবে। তার দায়িত্ব পালনকালে সংগঠটি দেশের বিভিন্ন স্থানে নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রশংসা কুড়ানোসহ একাধিক পুরস্কার লাভ করেছে। একাধিকবার যশোর ইনস্টিটিউট পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংগটনটির উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। যশোর ইনস্টিটিউট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচলনা পর্ষদের র্দীঘদিন বিভিন্ন পদ অলংকৃত করে স্কুলটির উন্নয়নে দিয়েছেন নেতৃত্ব। যশোর পালবাড়ি মোড়ে ভাস্কর্য ‘বিজয়-৭১’ এবং বকুলতলায় দেশের বৃহত্তম ‘বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল’ নির্মাণের অন্যতম রূপকার একরাম -উদ-দ্দৌলা । বর্তমানে যশোর উদীচীর উপদেষ্টা, পরিবার কল্যাণ সমিতির যুগ্ন-সম্পাদক, জেলা শিল্পকলা একাডেমির জীবন সদস্য ও যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভপতি হিসেবে সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন । সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব একরাম-উদ-দ্দৌলা তার সাংসারিক জীবনে অর্ধাঙ্গীনি হিসেবে পেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের মেয়ে নিলুফার ইয়াসমিন নিলুকে। তাদের একমাত্র পুত্র এহসান-উদ-দৌলা মিথুন প্রথম আলোর স্টাফ ফটো সাংবাদিক হিসাবে ১৫ বছর দক্ষতার সাথে কাজ করার পর প্রথম আলো ছেড়ে পিতার পাশে এসে দৈনিক কল্যাণ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সিহাবে দায়ত্বি ভার গ্রহন করেছেন । দু’কন্যার মধ্যে বড় মেয়ে রুবাইয়াত সুলতানা লীনা উদীচী পরিচালিত ‘অক্ষর’ স্কুলের শিক্ষিকা ও ছোট মেয়ে সুমাইয়া সুলতানা ঢাকার উত্তরায় প্রখ্যাত ইয়েল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। দৈনিক কল্যাণ সম্পাদক একরাম-উদ-দ্দৌলা সাংবাদিকতা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণে কাজ করার জন্য পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার। তার প্রাপ্ত উল্লেখ্যযোগ্য পুরস্কাারের মধ্যে রয়েছে অসাস্প্রদায়িক চেতনায় সাংবাদিকতার জন্য আহমদুল কবির স্মৃতি স্বর্ণপদক।