নিজস্ব প্রতিবেদক
চাকরি করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাধারণ একজন ‘বিক্রয় সহকারী’ হিসেবে। বেতন পান সরকারি স্কেল অনুযায়ী সামান্য কয়েক হাজার টাকা। কিন্তু এই সামান্য আয়েই যশোর শহরের বুকে গড়ে তুলেছেন ৫ তলা বিশিষ্ট এক আলিশান ভবন, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা! রূপকথার আলাদিনের চেরাগ নয়, বরং চোরাই বইয়ের সিন্ডিকেট আর দুর্নীতির পাহাড় চড়ে এই বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন যশোর কার্যালয়ের বিক্রয় সহকারী মো. নজরুল ইসলাম।
সিন্ডিকেটের মায়াজাল: উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত থাবা :
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থাকার সুবাদে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এক শক্তিশালী ‘বই সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন। তার এই দুর্নীতির নেটওয়ার্ক মূলত বিস্তৃত হয়েছে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রগুলোতে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ ও চোরাই বই সংগ্রহ করে কোনো প্রকার সরকারি রশিদ ছাড়াই তিনি এসব বই চড়া মূল্যে বিক্রি করেন।
এই সিন্ডিকেটের কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। নজরুল ইসলাম তার অনুগত কতিপয় ফিল্ড সুপারভাইজারের মাধ্যমে গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে সরকারি নিয়ম বহির্ভূতভাবে এসব চোরাই বই কিনতে বাধ্য করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, ‘আমাদের ওপর মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয় এই বইগুলো কেনার জন্য। টাকা না দিলে বা প্রতিবাদ করলে চাকরিতে সমস্যার হুমকি দেওয়া হয়। যেহেতু আমরা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করি, তাই উপর মহলের ভয়ে মুখ খুলতে পারি না।’
শিক্ষা উপকরণে দুর্নীতির মহোৎসব :
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নজরুল ইসলাম দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অত্যন্ত কম দামে চোরাই বা অবিক্রিত বই সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো যশোর কার্যালয়ের অধীনে থাকা বিভিন্ন কেন্দ্রের শিক্ষকদের কাছে চড়া মূল্যে পৌঁছে দেন। এই বিক্রির লভ্যাংশের একটি ক্ষুদ্র অংশ সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজাররা ‘কমিশন’ হিসেবে পেলেও সিংহভাগ চলে যায় নজরুলের ব্যক্তিগত তহবিলে। এভাবে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজের পকেটে ভরছেন এই অসাধু কর্মচারী। যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী চরম অসদাচরণ ও আর্থিক দুর্নীতির শামিল।
শহরের বুকে ১০ কোটির ‘আলিশান’ বাড়ি :
যশোর শহরের একটি অভিজাত এলাকায় নজরুলের নির্মিত ৫ তলা ভবনটি এখন এলাকাবাসীর বিস্ময়ের কারণ। সরেজমিনে দেখা গেছে, আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর এই ভবনটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা। একজন সাধারণ বিক্রয় সহকারী, যার বেতন কাঠামো নির্ধারিত, তিনি কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হলেন, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এই ভবনের প্রতিটি ইট যেন দুর্নীতির সাক্ষ্য দিচ্ছে। নজরুলের এই বৈধ আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি এখন ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়েছে।
ক্ষমতার দাপট ও দাপ্তরিক বিশৃঙ্খলা :
নজরুল ইসলামের খুঁটির জোর কোথায় ? অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার এক নিকটাত্মীয় (আপন শালা) পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত থাকায় সেই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি অফিসে নিজের সমান্তরাল প্রশাসন চালান। দাপ্তরিক নথিপত্র ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নজরুল ইসলাম অত্যন্ত উদ্ধত ও বেপরোয়া প্রকৃতির। ইতিপূর্বে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক উপপরিচালক রবিউল ইসলামের সাথে চরম অশোভন আচরণ ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে মহাপরিচালক তাকে লিখিতভাবে সতর্ক করেছিল।
কিন্তু সেই সতর্কবার্তাকে তোয়াক্কা না করে তিনি তার অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি বর্তমানেও তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়াই নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন এবং অধিকাংশ সময় তার ব্যক্তিগত বইয়ের ব্যবসার তদারকি করেন। অফিসের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি এখন একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ :
এই পাহাড়সম দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে যশোর জেলা কার্যালয়ের বর্তমান উপপরিচালক বিল্লাল বিন কাশেমের নিকট সরাসরি জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো মন্তব্য করতে সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তার নিরবতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
অন্যদিকে, অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, নজরুল ইসলামের কর্মকাণ্ডে আমরা লজ্জিত ও অতিষ্ঠ। তিনি শুধু প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিই নষ্ট করছেন না, বরং সৎ কর্মচারীদের জন্য একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছেন। তার এই সিন্ডিকেট বাণিজ্য থামানো না গেলে সাধারণ মানুষ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। তারা অতি দ্রুত উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে নজরুলের সম্পদের হিসাব গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
কারণ দর্শানোর নোটিশ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ :
ইতিমধ্যেই উপপরিচালক কর্তৃক সচিব বরাবর প্রেরিত এক অভিযোগপত্রে নজরুলের বিরুদ্ধে ৯টি সুনির্দিষ্ট গুরুতর অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: রশিদবিহীন বই বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ। কর্তৃপক্ষের সাথে অভদ্র আচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গ। অবৈধ সিন্ডিকেট পরিচালনা। কর্মস্থলে অনুপস্থিতি। আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে ইতিপূর্বে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে সতর্ক এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান করলেও তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং তিনি তার প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন যশোর কার্যালয়ের বিক্রয় সহকারী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমি বই বিক্রিতে ১১ বার দেশ সেরা পুরস্কার পেয়েছি। স্বীকৃতিস্বরুপ সরকার আমাকে তিনবার বিদেশে পাঠিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা। আমার বাড়িতে গেলেই এর প্রমাণ মিলবে। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার।
সর্বশেষ
- বিদ্যুৎ সাশ্রয় : সারাদেশে রাত ৮টার মধ্যে সব দোকান-শপিংমল বন্ধের সিদ্ধান্ত
- ইফার বই বিক্রয় সহকারী নজরুল কোটিপতির রহস্য কী ?
- এসএসসিতে নকল ঠেকাতে কঠোর যশোর শিক্ষা বোর্ড
- হেঁটে হেঁটে প্রধানমন্ত্রীর তদারকি
- জ্বালানিতে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার : প্রতিমন্ত্রী অমিত
- রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বাস পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, যাত্রীর উদ্ধারে অভিযান শুরু
- ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে দেশব্যাপী এক মিনিট ‘ব্ল্যাকআউট’ কর্মসূচি
- ইরান যুদ্ধে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না ট্রাম্প, খুঁজছেন বের হওয়ার পথ
