আজ থেকে জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হলেও দেশে আপাতত জ্বালানি তেলের বিক্রিতে আর কোনো রেশনিং থাকছে না। আজ রোববার থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনমতো পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল কিনতে পারবেন।
সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, “আজ থেকে জ্বালানি তেল বিক্রিতে কোনো রেশনিং থাকবে না। সবাই তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী তেল কিনতে পারবেন।”
আতঙ্কে বেড়েছিল চাহিদা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে দেশে অনেকেই স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ হারে তেল কিনতে শুরু করেন। ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও চাপ তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৬ মার্চ থেকে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করে। শুরুতে মোটরসাইকেলের জন্য সর্বোচ্চ ২ লিটার তেল বিক্রির নিয়ম করা হয়, যা পরে বাড়িয়ে ৫ লিটার করা হয়।
এ ছাড়া ৭ মার্চ থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদার তুলনায় ২৫ শতাংশ কম সরবরাহ দেওয়া হচ্ছিল। পরে ১১ মার্চ বিভাগীয় শহরগুলোতে সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়।
ঈদযাত্রা ও কৃষি সেচের কথা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত
সরকার বলছে, সামনে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাড়ছে মানুষের যাতায়াত। একই সময় কৃষি সেচের জন্য ডিজেলের চাহিদাও বেড়ে যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই তেল বিক্রির সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে।
ফিলিং স্টেশন মালিকদের চাপ
চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহের দাবিতে বিভিন্ন জায়গায় ফিলিং স্টেশন মালিকরা আন্দোলনের ইঙ্গিত দেন। খুলনায় গত শনিবার ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ রাখেন তারা। রাজশাহীতেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
জাহাজে আসছে নতুন জ্বালানি
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, মার্চ মাসে মোট ১৮টি জাহাজে জ্বালানি তেল দেশে আসার কথা। এর মধ্যে ১৪ মার্চ পর্যন্ত ৬টি জাহাজ এসে পৌঁছেছে।
আগামী ২৭ মার্চের মধ্যে আরও ৬টি জাহাজ আসার সময়সূচি রয়েছে, তবে বাকি ৬টি জাহাজের সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রতিটি জাহাজে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল থাকে। বেশির ভাগ জাহাজই ডিজেল নিয়ে আসছে।
এ ছাড়া ১৭ বা ১৮ মার্চ একটি জাহাজ ফার্নেস তেল নিয়ে আসার কথা রয়েছে। পাশাপাশি খোলাবাজার থেকে একটি অকটেনবাহী জাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশে কত তেল মজুত আছে
বিপিসি সূত্র জানায়—
দেশে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ টন ডিজেল মজুত আছে
জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য আরও প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে
পেট্রল ও অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার টন করে
দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টন পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন হচ্ছে। দৈনিক চাহিদা প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ টন।
ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সতর্কতা
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার চুক্তি রয়েছে। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হলে সরবরাহকারীরা তেল পরিশোধনে সংকটে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে মে মাসে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সরকারি পর্যায়ে সরাসরি বা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেনার পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যে ভারতের কাছেও অতিরিক্ত সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, বর্তমান মজুত ও নতুন জাহাজ আসার ধারাবাহিকতায় মার্চ মাসে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো বড় সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে কেউ যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করতে শুরু করেন, তাহলে বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।
