জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: ঘড়ির কাটায় তখন দুপুর ১২ টা ২৫ মিনিট। যশোর শহরের বেজপাড়ায় ওএমএস’র ডিলার গোলাম মোস্তফার দোকানে একজন কিশোরীকে বসে থাকতে দেখা যায়। সে জানায়, আজ চাল-আটা দেয়া শেষ। এরমধ্যে দ্রুতগতিতে ভ্যান চালিয়ে আসেন এক যুবক। একই সময়ে প্যাকেট হাতে করে আসেন এক গৃহবধূ। তাদের দু’জনকেই বলা হয় আজ আর হবে না, কাল আসেন।
ওই কিশোরীর নাম চাঁদনী। এখানে কাজ করি। ডিলার কোথায় এবং তার মোবাইল নম্বর আছে কি-না জানতে চাইলে সে জানায় ডিলার বাইরে গেছে। মোবাইল নম্বর মুখস্থ নেই। মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করার সময় ওই ভ্যানচালক এগিয়ে আসেন। তার নাম রাজু। তিনি বলেন, ডিলারের দোষ নেই, দোষ আমার। তিনি বলেন-ওএমএস’র চাল-আটা নিতে খুব সকালে আসতে হয়।
একই কথা বলেন-ওই গৃহবধূ। এরমধ্যে ছুটে বেরিয়ে যায় ওই কিশোরী। দোকানে এসে বসেন মধ্যবয়সী এক নারী। জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন-আমার নাম জোসনা। ওই কিশোরী আমার মেয়ে। সুর পাল্টে তিনি বলেন, ডিলার গোলাম মোস্তফার ছেলে ইমরান বাইরে গেছে। সে এসেই ফের বেচাবিক্রি শুরু করবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বেশ কয়েকজন বলেন- মাস কয়েক আগেও মোস্তফার ঘর নিয়মিত খোলা থাকতো না। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির কারণে তদারকি বাড়িয়েছে খাদ্য অফিস। মাস দুয়েক নিয়মিত দোকান খুলতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার দুর্ব্যবহারের কারণে এলাকার মানুষ অন্য ডিলারের কাছে যায়।
এর আগে বেলা সোয়া ১১টায় রাসেল চত্বর (চারখাম্বার মোড়) ডিলার তোতা মিয়ার দোকানে দেখা যায়, নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। এ সময় গোলপাতা হোটেল এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম ও বৃদ্ধ হাশেম আলী জানান, স্লিপ পেয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কখন পাবো জানি না। কিসের স্লিপ প্রশ্ন করা হলে তোতা মিয়ার ছেলে রফিকুল জানান, বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে স্লিপ সিস্টেম করেছি।
তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি ৫ কেজি চাল কিনতে পারছেন। আটা কিনলে চাল পাওয়ার সুযোগ নেই।
একইদিন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্টেশনে বাহাউদ্দিনের ডিলার পয়েন্টে নারী-পুরুষের ভিড় দেখা যায়। লাইনে দাঁড়িয়ে চাল-আটা কেনেন উপকারভোগীরা।
একাধিক সূত্রের দাবি, সরকারের সাশ্রয় মূল্যের ওএমএস’র চাল-আটা নিয়ে নয়-ছয় বন্ধ হয়নি। কৌশল বদলানো হয়েছে মাত্র। বিসিকের যেসব মিল আটা সরবরাহ করে, সেইসব মিলে সিংহভাগ আটা বিক্রি করে দেয় কতিপয় অসাধু ডিলার। কাগজপত্রে উত্তোলন ও দোকানের খাতায় ডান হাত-বাম হাতের আঙুলের ছাপ দিয়ে বেচাবিক্রির হিসাব ঠিক রাখা হয়।
একই ঘটনা ঘটে আসছে চাল উত্তোলন ও বেচাবিক্রিতেও। সূত্রের দাবি, ডিলাররা গড়ে তুলেছে গোপন সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেট নির্ধারণ করে বিক্রির পরিমাণ। তদারকি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেন সিন্ডিকেট প্রধান। তবে অনন্ত ৩ জন ডিলার রয়েছেন সিন্ডিকেটের বাইরে। ক্ষমতার প্রভাবে তারা কাউকেই তোয়াক্কা করেন না।
কয়েকজন উপকারভোগীর অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার এক পর্যায়ে বলা হয়, আজ শেষ, কাল আসেন। তারা জানান-৩১৪ জনের জন্য ৩১৪ বার চাল আটা তুলতে হয় ওজনের মেশিনে। এ হিসেবে দুপর ১২টা-একটা’র মধ্যে বরাদ্দ শেষ হতে পারে না।
যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অফিস সূত্রে জানা যায়-যশোর পৌরসভায় ১৩ ও বিসিকে ১জনসহ মোট ১৪ জন ডিলারে মাধ্যমে ওএমএস’র চাল-আটা বিক্রি করা হয়।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুন্ডু জানান, আমরা মনিটরিং করি। কিন্তু মূল নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছেন কাউন্সিলররা। তবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান এই শীর্ষ খাদ্য কর্মকর্তা।