“বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের চিন্তাভাবনা, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা ইত্যাদির স্তর সম্পর্কে এ দেশের সাধারণ মানুষের সবারই কমবেশি জানা আছে। ফলে তাদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাত ত্রুটিতে দেশে যদি করোনার পুনঃবিস্তার ঘটে, তজ্জন্য তাদেরকে দোষারোপ করে বা তাদের ত্রুটির জন্য তাদেরকে দায়ী করে শেষ পর্যন্ত করোনার হাত থেকেতো রেহাই পাওয়া যাবে না। অতএব আসুন আত্মস্বার্থেই আমরা করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। সেক্ষেত্রে উপরে যে ন’টি প্রস্তাব তুলে ধরা হলো, সেগুলোর কিছুও যদি উল্লিখিত প্রতিরোধ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়, তাহলে সেটিই হবে এ আলোচনার মোদ্দা প্রাপ্তি ও ফলাফল।”
আবু তাহের খান: আমি জনস্বাস্থ্য শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নই। ফলে এ নিয়ে অভিমত বা সুপারিশমূলক বক্তব্য দেয়ার এখতিয়ার বা বিশেষজ্ঞতা কোনোটাই আমার নেই। তবে দীর্ঘ প্রায় দু’বছর করোনার সঙ্গে বসবাস করার সুবাধে দেশের অনেক সাধারণ মানুষই এখন বিষয়টিকে বুঝেন এবং এতদসংক্রান্ত করণীয়-অকরণীয় সম্পর্কে প্রাথমিক পর্যায়ের ধারণা রাখেন। আর সে সুবাধেই বাংলাদেশে করোনার তৃতীয় ঢেউ দেখা দেওয়ার আশঙ্কার প্রেক্ষিতে দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এখানে কতিপয় পর্যবেক্ষণ অতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
প্রথমত: করোনার তৃতীয় ঢেউ দেখা দেওয়ার প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ৪ জানুয়ারি একটি ১৫ দফাভিত্তিক নির্দেশনা জারি করেছে, যার অধিকাংশই করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালে জারি করা আছে এবং অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই অদ্যাবধি সেগুলো বাতিল করা হয়নি, কোনো কোনোটি সংশোধন করা হয়েছে মাত্র। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, যেসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অদ্যাবধি বহাল আছে, সেগুলোই আবার নতুন করে জারি করা হলো কেন? এর মানে হচ্ছে, ইতোপূর্বে জারিকৃত নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে না এবং তা না হওয়াটাকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু কোনো নির্দেশনা বাস্তবায়িত না হওয়ার সমাধানতো সেটি আবার নতুন করে জারি করা নয়। বরং সেটি কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না তার কারণ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাটাই হচ্ছে সমাধানের উপায়। কিন্তু তা না করে একই নির্দেশনা পুনরায় জারি করলে সেক্ষেত্রে উভয় নির্দেশনাই তার ওজন ও গুরুত্ব হারায়। বস্তুত সে ঘটনাই এখন করোনার তৃতীয় ঢেউকে সামনে রেখে দেশে ঘটতে চলেছে। তদুপরি এসব নির্দেশনার মধ্যে কোনটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটি কম গুরুত্বপূর্ণ সেটিও একটি বিবেচনা বৈকি! কিন্তু সে বিবেচনাসমূহ যথাযথ মনোযোগ পাচ্ছে কিনা সে বিষয়টির প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি বলে মনে করি।
আগেই নির্দেশনা জারি করা আছে যে, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে এবং তা চলার জন্য কী কী করতে হবে বা কী কী করা থেকে বিরত থাকতে হবে, সেসবও আগে থেকেই চিহ্নিত করা আছে। এরূপ পরিস্থিতিতে গত ৩ জানুয়ারি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সর্বাগ্রে যা যা করার কথা বলা হলো এবং পরে ৪ জানুয়ারি জারিকৃত নির্দেশনায় যা যা যুক্ত করা হলো তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, টিকা গ্রহণের সনদ প্রদর্শন ব্যতিরেকে হোটেল ও রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করা যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের শতভাগ মানুষকে কি ইতোমধ্যে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেও যিনি এরই মধ্যে টিকা পাননি এমন কেউ যদি ক্ষুধার্ত অবস্থায় রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে চান, তার জন্য সমাধানটি কী?
আসলে জনসমাগম ঠেকাবার জন্য রেস্তোরাঁ বা হোটেলে প্রবেশ ঠেকানো করোনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তের মূল অগ্রাধিকার নয় মোটেও। আসলে এসব অগ্রাধিকার নির্ধারণকারীদের কেউ হয়তো বিদেশের হোটেল-রেস্তোরাঁয় যেয়ে এরূপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন অথবা এরূপ হওয়ার কথা অন্যের মুখ থেকে জেনেছেন। আর তাতেই তারা তাদের উর্বর মস্তিষ্কজাত চিন্তা থেকে এটিকে প্রয়োগ করার ব্যাপারে অতিউৎসাহী হয়ে ওঠেছেন। আর তাই আবারো বলা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় লোকসমাগম ঠেকানো করোনা নিয়ন্ত্রণে এই মুহূর্তে কিছুতেই বাংলাদেশের মূল অগ্রাধিকার কৌশল হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে ২০২০-এ করোনা দেখা দেওয়ার পর থেকে মানুষ এমনিতেই এখন পারতপক্ষে হোটেল রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে চান না। অতএব এ নিয়ে অতোটা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই (হোটেল-রেস্তোরাঁয় যাওয়াকে উৎসাহিত করা হচ্ছে না)।
আসলে করোনা নিয়ন্ত্রণে এই মুহূর্তের সর্বাগ্র করণীয় হচ্ছে বৃহৎ জনসমাগমগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা, যার মধ্যে একেবারে প্রথমেই আসে পোশাক কারখানা, বিপণী বিতান, মেলা ও প্রদর্শনী (যার মধ্যে বাণিজ্যমেলা অন্যতম), নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মিছিল ও জনসভা ইত্যাদি। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৫ দফা নির্দেশনায় কি এ বিষয়গুলো সেভাবে আছে বা সে অগ্রাধিকার রক্ষিত হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, জারিকৃত নির্দেশনা যতোটা না করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি লোক দেখানো। কিন্তু করোনা-জীবাণুতো আমাদের নীতিনির্ধারকদের মতিগতি বুঝে চলে না বা সেটি তারা বুঝতেও পারে না। অতএব যা যা করলে করোনার প্রসার ও বিস্তার থামানো যাবে, সেটিই আমাদেরকে করতে হবে- এখানে উর্বর মস্তিষ্কের জ্ঞান প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই এবং তা করতে গেলে আমরা নিজেরাই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
করোনার তৃতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে তাই এই মুহূর্তের জরুরি করণীয় হিসেবে কতিপয় সরাসরি প্রস্তাব এখানে তুলে ধরা হলো: ১) বিমান, স্থল ও নৌবন্দরগুলোতে করোনা নিয়ন্ত্রণ নীতিমালার কড়াকড়ি প্রয়োগ নিশ্চিত করা (বর্তমানে এ ক্ষেত্রে খুবই ঢিলেঢালা পরিস্থিতি বিরাজ করছে); ২) টিকা সনদ ছাড়া পোশাক কারখানায় কাউকে কাজ করতে না দেয়া (এ ক্ষেত্রে মালিকদেরকে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে); ৩) মাস্ক ছাড়া একজন মানুষকেও (ক্রেতা, বিক্রেতা বা সহায়ক কর্মী) বিপণীবিতানে প্রবেশ বা অবস্থান করতে না দেয়া; ৪) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মেয়াদ অবশ্যই সংক্ষিপ্ত করা; ৫) সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবিলম্বে স্থগিত করা; ৬) জনগম সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানাদি (বিয়ে, সামাজিক ও ধর্মীয় সমাবেশ, সম্মেলন, মিছিল ইত্যাদি) বন্ধ রাখা; ৭) গণপরিবহনে মাস্ক ছাড়া ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা; ৮) শেয়ারবাজার, বিপণীবিতান, কাঁচাবাজার ইত্যাদির সময়সীমা কমিয়ে আনা; ৯) কোথাওই এবং কোনো অবস্থাতেই কাউকে যেন মাস্কবিহীন অবস্থায় দেখতে না পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। বস্তুত শেষোক্ত প্রস্তাবটিই মূল রক্ষাকবচ, যা নিশ্চিত করার জন্য কর্তৃপক্ষীয় কড়াকড়ি যেমন দরকার, তেমনি একইভাবে দরকার এক ধরনের সামাজিক সচেতনতা ও সহযোগিতাও। প্রত্যকে যদি নিজের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তীজনকেও মাস্ক পরতে উদ্বুদ্ধ করেন, তাহলে কাজটি অনেকখানিই সহজ হয়ে যায় বৈকি।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের চিন্তাভাবনা, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা ইত্যাদির স্তর সম্পর্কে এ দেশের সাধারণ মানুষের সবারই কমবেশি জানা আছে। ফলে তাদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাত ত্রুটিতে দেশে যদি করোনার পুনঃবিস্তার ঘটে, তজ্জন্য তাদেরকে দোষারোপ করে বা তাদের ত্রুটির জন্য তাদেরকে দায়ী করে শেষ পর্যন্ত করোনার হাত থেকেতো রেহাই পাওয়া যাবে না। অতএব আসুন আত্মস্বার্থেই আমরা করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। সেক্ষেত্রে উপরে যে ন’টি প্রস্তাব তুলে ধরা হলো, সেগুলোর কিছুও যদি উল্লিখিত প্রতিরোধ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়, তাহলে সেটিই হবে এ আলোচনার মোদ্দা প্রাপ্তি ও ফলাফল।
লেখক-গবেষক ও প্রাবন্ধিক।