শাহারুল ফারদিন: ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের বিরামহীন উটকো ঝামেলায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। অবস্থা এমন হাসপাতালে রোগীর চেয়ে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড় বেশি। অথচ তাদের হাসপাতালে আসা বারণ।
কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড়ে বৃদ্ধ, শিশু ও মহিলা রোগীরা সেবা নিতে এসে নাকাল হয়ে পড়ছেন। দিনভর হাসপাতালটি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দখলে থাকে। সকাল থেকেই তারা ওয়ার্ডগুলোতে বিচরণ করতে থাকেন। দলে দলে ভাগ হয়ে হাসপাতালের ভেতরে ডাক্তারের চেম্বারের সামনে অবস্থান নিয়ে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে টানা হেঁচড়া করেন। দেখেন কোন কোম্পানির ওষুধ লেখা হয়েছে। এ সময় তারা প্রেসক্রিপশনের ছবিও তোলেন।
রোগীদের বসার চেয়ারগুলোতে ব্যাগ রেখে দোকান খুলে বসেছেন তারা। ডাক্তারদের ভিজিট করার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। অফিস সময়ে হাসপাতালে যাওয়ার নিয়ম না থাকলেও সকাল ১০টার আগেই দলে দলে ভাগ হয়ে সেখানে অবস্থান নিচ্ছেন প্রতিনিধিরা। হাসপাতালের ডাক্তারদের বিভিন্ন কক্ষের সামনের রোগীদের ভিড় থাকার সুযোগ নেন তারা। কক্ষ থেকে রোগী বের হওয়া মাত্রই ছো মেরে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে নেন। অনেক সময় টানাটানি করেন। জানার চেষ্টা করেন তার কোম্পানির ওষুধ লেখা হয়েছে কি না। এতে রোগীরা বিরক্ত হলেও তাদের জোটবদ্ধতার কারণে ভয়ে কিছু বলার সাহস পান না। স্কয়ার, ইনসেপ্টা, অফসোনিন, একমি, এসকেএফ, রেসকোসহ বেশ কিছু বিক্রয় কোম্পানির এক একজনের ৪/৫ জন বিক্রয় প্রতিনিধি দেখা যায়।
করোনারি কেয়ারে বর্হিবিভাগে কয়েকজন ডাক্তারের চেম্বারে আনাগোনা বেশি। মঙ্গলবার সকালে করোনারি কেয়ারে ১২ নম্বর রুমের মেডিসিন ডাক্তার হাবিবুর রহমান, তিন নম্বর ডাইবেটিকস এর কল্লোল সাহাসহ অর্থপেটিক, গাইনি নিউরো মেডিসিনসহ কয়েকজন ডাক্তারের রুমে ও রুমের দরজায় ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিদের ভিড় দেখা যায়।
এ সব প্রতিনিধিরা ওয়ার্ডে ঢুকে সিস্টারদের কাছে থাকা রোগীদের ফাইল নিয়েও টানাটানি করে থাকেন। সিস্টাররাও ফাইল দিয়ে দেন অবলীলায়।
সকাল থেকে জরুরি বিভাগ ও বর্হিবিভাগের সামনে এবং করোনারি কেয়ারের সামনে অবস্থান করছিলেন তিন থেকে চারশত ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি। এ সময় হাসপাতালে রোগীর ভিড় ছিল।
হাসপাতালের করোনারি কেয়ারের সামনে ওষুধ কোম্পানির কয়েকজন প্রতিনিধি অবস্থান করছিলেন। পরিচয় জানতে চাইলে তাদের একজন নিজেকে জিসকা কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। নিজের নাম বলেন জব্বার রহমান। কেন ভেতরে ঢুকেছিলেন জানতে চাইলেই দ্রুত সটকে পড়েন।
একই সময় হাসপাতালের নিচতলায় বর্হিবিভাগের গেটের সামনে অবস্থান করছিলেন বিপুল বিশ্বাস নামে একজন। তিনি বলেন, কয়েকটি কোম্পানির হয়ে তিনি কাজ করেন। মূলত কোম্পানিগুলোর তথ্য সংগ্রহ করাই তার কাজ।
ওষুধ বিতরণ কেন্দ্রের সামনে অবস্থান নিয়ে রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলছিলেন এ্যালকো ফার্মার প্রতিনিধি অর্জুন দে। তিনি জানান, কারও সমস্যা সৃষ্টি করছেন না। শুধু ছবি তুলছেন।
শহরের বারান্দিপাড়ার আসলাম আলী হাসপাতালে আসা সেবাপ্রার্থী বলেন, যখনই হাসপাতালে আসি তখনই দেখি কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড়। ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিয়ে রোগীরা বেরিয়ে এলেই প্রেসক্রিপশন দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এতে রোগী ও তার স্বজনরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
হাসপাতালের কর্মচারী মনিরুল ইসলাম বলেন, নিয়মানুযায়ী সপ্তাহে দুদিন নির্দিষ্ট সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসকদের সাথে দেখা করতে পারবেন কোম্পানির প্রতিনিধিরা। কিন্তু তারা নিয়ম অমান্য করে প্রতিদিন হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করে ও হাসপাতালের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে শুরু করেন। এ ছাড়াও হাসপাতালের বর্হিবিভাগের সামনে রোগীদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে তাদের কোম্পানির ওষুধ লেখা আছে কি না তা দেখতে রোগীদের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রিপ্রেজেনটেটিভ জানান, আমরা এভাবে রোগী বা রোগীর আত্বীয়-স্বজনদের ভোগান্তিতে ফেলতে চাই না। তবে, চিকিৎসক আমাদের কোম্পানির ওষুধ লিখল কিনা সেটা ছবি তুলে কোম্পানিতে না পাঠালে প্রতি মাসিক মিটিং এ বসরা গালিগালাজ করেন।
হাসপাতালটির ব্যবস্থপনা কমিটির সদস্য এসএম জাহাক্সগীর হোসেন জানান, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতাল থেকে বারবার তাড়িয়ে দিলেও তারা আবার অন্যপাশ দিয়ে প্রবেশ করে। কোনভাবেই তাদেরকে ঠেকানো সম্ভবকর হচ্ছেনা।
এ বিষয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, অফিস চলাকালীন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতালে আসা অবৈধ। এটি তারা করতে পারেন না। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে তাদের সমিতিকে অবহিত করা হয়েছে। চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে প্রথম কয়েকদিন তারা বিরত থাকেন। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার ছুটে আসেন। তবে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।