জাহাঙ্গীর আলম
‘একটা সময়ে বাংলার প্রায় ঘরের রান্না থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া আর অতিথি আপ্যায়নসহ প্রায় সব কাজেই মাটির তৈরি পাত্র ব্যবহার করা হতো। স্বাস্থ্যকর আর সহজলভ্য ছিলো বলে অধিকাংশ পরিবারেই ছিলো এগুলোর ব্যবহার। তবে বর্তমানে নানাবিধ ব্যবহারে জীবনযাত্রা সহজ করছে প্লাস্টিক আর কাঁচ এর পণ্য। কিন্তু প্লাস্টিকপণ্য এখন পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তার বিপরীতে মৃৎশিল্প পরিবেশবান্ধব। এমন একটি শিল্প কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে এমনটাই বলছিলেন সাবেক বন কর্মকর্তা সামসুল হক রিপন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বিসিক উদ্যোক্তা মেলা ঘুরে দেখা যায়, মাটির তৈরি নান্দনিক ও রুচিসম্মত তৈজসপত্র, ফুলদানি ও শিশুদের খেলনার পসরা সাজিয়ে বসেছেন গোপালগঞ্জ থেকে আসা উদ্যোক্তা মাসুদ সরদার হিরা। মেলায় আগত দর্শনার্থীরা মাটির তৈরি ওই সব পণ্য দেখেন এবং পছন্দ মতো পণ্য কেনেন। একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ব্যবহৃত হতো খাবারের পাত্র হিসেবে থালা-বাসন, পানির পাত্র হিসেবে কলস, টাকা জমানোর জন্য মাটির ব্যাংক । ওইসব বিলুপ্ত মাটির পণ্য তৈরি করেছেন ওই মৃৎশিল্পী। যা আলাদা করে নজর কাড়ছে দর্শনার্থীদের। ওই শিল্পী তার মনের কল্পনাকে প্রধান্য দিয়ে শিশুদের খেলার এবং শেখার জন্য তৈরি করেছে টিয়া, কাঠঠোকরা, ঈগল, চড়ুই, হাঁসপাখি, রাজহাঁস, ময়ূর, পেঙ্গুইন, বিড়াল, শিয়াল, কচ্ছপ, কুকুর, বাঘ, মোরগ, হাতি, পুতুল, তেলাপিয়া মাছ, ডিম। এছাড়াও ফলের মধ্যে বেল, কুমড়ো, টমেটো, ফুলকপি, উচ্ছে, পটল, বেগুন, আপেল, কমলা লেবু, গাজর, শসা, ডিম, কাঁচা মরিচ, পেঁপে, ঢেড়শ, কলা, আম, আতা, লিচু, স্ট্রবেরি, কাঁঠাল, রসুন, ক্যাপসিকাম।

মারিয়া মৃৎ কুঠির শিল্প বাজার’র সত্ত্বাধিকারী ও মৃৎশিল্পী মাসুদ সরদার হিরা বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে প্লাস্টিক আর কাঁচের তৈরি পণ্য দেশের বাজার দখল করে নিয়েছে। তবে এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি মাটির তৈরি পণ্য। যদিও আগের মতো ব্যবসা আর নেই। এখনও দর্শনার্থীদের মেলায় অন্যতম অকর্ষণ থাকে মাটির তৈরি নান্দনিক পণ্য। তবে দিনে দিনে এ পেশায় নতুন করে আর কেউ আসতে চাই না, যারা আছে তারাও অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। বিসিক মেলায় দর্শনার্থীদের বেশি আকৃষ্ঠ করছে শিশুদের জন্য আনা খেলনা। এসব খেলনা থেকে শিশুরা বিভিন্ন ফল, পশু ও পাখির নাম জানতে পারবে। যা তাদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করবে। এছাড়াও এসব মাটির তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব হওয়াতে শিশুদের কোন ক্ষতি হয় না। গত কয়েক দিনের থেকে আজ (শুক্রবার) বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঝাঁকে-ঝাঁকে প্রবেশ করছে মেলায়। বিকিকিনি মোটামুটি ভালোই চলছে’।
মেলায় ঘুরতে আসা কয়েকজন শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা হয়। দর্শনার্থী রানা শিকদার বলেন, ঘুরে ঘুরে দেখছি বিভিন্ন পণ্য, ছেলের জন্য কিছু মাটির তৈরি খেলনা নিয়েছি। বাসায় নিয়ে গেলে ছেলে এগুলো নিয়ে খেলা করতে পারবে এবং ফল ও পশু-পাখির নাম মুখস্থ করতে পারবে। এছাড়াও মাটির তৈরি ফুলদানি, বদনা ও চায়ের কাপ নিয়েছি। সরকারি এমএম কলেজের ভূগোল বিভাগের শিক্ষর্থী সবুজ হোসেন ও তার বান্ধবী ঊর্মি খাতুন বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের ফলে মাটি দূষিত হয় এবং এতে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের কারণে জীবজগত ও উদ্ভিদকূল উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া প্লাস্টিক দূষণের কারণে মাটির ঊর্বরতা ব্যাহত হয়, কৃষি উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতা বিঘ্নিত হয়। অন্যদিকে মাটির তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব। তাই মাটির তৈরি পণ্য’র ব্যবহারে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
