১০ বছরেও গ্রেফতার হয়নি, কন্যাদহে প্রকাশ্যে চলাফেরার অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
হত্যা মামলায় আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড মাথায় নিয়েও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ইউনুস আলী ওরফে ইউনুস। যশোরের শার্শা উপজেলার কন্যাদহ গ্রামের আইয়ুব হোসেন হত্যা মামলার এই দণ্ডিত আসামিকে রায়ের পর প্রায় ১০ বছরেও গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে তিনি শার্শার কন্যাদহ এলাকায় অবস্থান করে প্রভাবশালী শহিদুল ইসলাম শহীদের সঙ্গে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা একজন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি কীভাবে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন—এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই ইউনুস গ্রেফতার এড়িয়ে চলার সুযোগ পাচ্ছেন।
অভিযোগের তীর কন্যাদহ গ্রামের শহিদুল ইসলাম শহীদের দিকে। স্থানীয়ভাবে ‘গোল্ড শহীদ’ নামে পরিচিত শহিদুল ইসলাম শহীদ সম্প্রতি উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এলাকাবাসীর দাবি, ইউনুস আলীকে বিভিন্ন সময় তাঁর সঙ্গে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। তবে ইউনুসকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে শহিদুল ইসলাম শহীদ অভিযোগটি অস্বীকার কওে বলেছেন,ঘটনাটি সত্য নয়।
যে হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন :
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ১৯৯৭ সালের ২৩ অক্টোবর দুপুরে শার্শার চটকাপোতা গ্রামের মওলা বক্সের বাড়ির সামনে সড়কে হামলার শিকার হন আইয়ুব হোসেন। সকালে তিনি গ্রাম্য চিকিৎসক শের মোহাম্মাদকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে যশোরে গিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার পথে তাঁকে পথরোধ করে হামলা চালানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলাকারীরা আইয়ুব হোসেনকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে এবং পাইপগান দিয়ে গুলি করে গুরুতর আহত করে। পরে তাঁর মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
মামলার বিচারকালে রাষ্ট্রপক্ষ ২০ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে। প্রত্যক্ষদর্শী শের মোহাম্মাদ তাঁর সাক্ষ্যে ইউনুস আলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইয়ুব হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগ করেন। অন্যান্য সাক্ষীরাও হামলা ও ঘটনাস্থল থেকে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দেন।
২০১৬ সালে যাবজ্জীবন :
সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর যশোরের স্পেশাল জজ (জেলা জজ) ও বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক নিতাই চন্দ্র সাহা ইউনুস আলীসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
দণ্ডিত তিন আসামিই পলাতক ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত দুইজন পলাতক অবস্থায় মারা গেছেন। ফলে মামলায় জীবিত দণ্ডিত আসামি হিসেবে ইউনুস আলীই রয়েছেন।
ভারতে আত্মগোপনের পর দেশে ফিরে প্রকাশ্যে :
স্থানীয়দের দাবি, সাজা ঘোষণার পর ইউনুস আলী দীর্ঘ সময় ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশে ফিরে শার্শার কন্যাদহ এলাকায় অবস্থান করছেন। তাঁর স্থায়ী বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলার পাঁচপোতা গ্রামে হলেও কন্যাদহ এলাকায় তাঁকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, আগে আত্মগোপনে থাকা ইউনুস এখন আর খুব একটা রাখঢাক করছেন না। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রকাশ্যে চলাফেরার কারণে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
অপরাধপ্রবণ এলাকায় বাড়ছে উদ্বেগ :
কন্যাদহ ও আশপাশের এলাকায় অস্ত্রের ব্যবহার, বোমাবাজি ও সংঘাতের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যা মামলায় আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনের চোখে দণ্ডিত একজন আসামি যদি দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যায়। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ সত্য হলে সেটিও তদন্ত করে দেখা জরুরি।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে ইউনুস আলীকে গ্রেফতার করে আদালতের দেওয়া সাজা কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁকে কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকলে অভিযোগটি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
