দুর্গাপূজাকে ঘিরে প্রতিবছরের বিশেষ রপ্তানি অনুমতি এবারও না পাওয়ার শঙ্কা; একই সময়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানিও বন্ধ করেছে ঢাকা।
কল্যাণ ডেস্ক
আসন্ন দুর্গাপূজায় এবার ভারতে ইলিশ রপ্তানি না করার জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ভারত থেকে ইলিশ আমদানিও পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা। ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ইলিশ বাণিজ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, চলতি বছর ইলিশ বাণিজ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। গত দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে ৫০০ টনের বেশি ইলিশ রপ্তানি হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তে এই আমদানি প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মাছ ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশ সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ ভারতে রপ্তানির অনুমতি দিয়ে থাকে। সাধারণত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এবার এখনো সে ধরনের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বলেন, ২৩ সেপ্টেম্বর জারি করা একটি সার্কুলারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ছাড়পত্র বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ আমদানির প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি জানান, আগামী ৭ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশে ইলিশের প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে মাছ ধরা বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে দুর্গাপূজার আগে ভারতে বাংলাদেশি ইলিশ পাঠানোর সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
বাংলাদেশি ইলিশ, বিশেষ করে পদ্মার ইলিশের পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশি ইলিশের জন্য ক্রেতাদের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। এবার সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভোক্তারাও হতাশ হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্টস স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশের চলাচল বর্তমানে সম্পূর্ণ থেমে গেছে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকেও ভারতে ইলিশ পাঠানোর অনুমতি এবার নাও মিলতে পারে।
এর আগে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। গত আগস্টে ভারতীয় ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় গিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যসচিব আতাউর রহমান খানের সঙ্গে বৈঠক করে ভারতে ইলিশ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসেনি।
বাংলাদেশ ২০১২ সালে ভারতে ইলিশ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরে ২০১৯ সাল থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ বিবেচনায় সীমিত পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া শুরু হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ভারতে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি করা হয়েছিল। ২০২০ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ৮৫০ টনে দাঁড়ায়। ২০২১ সালে ১ হাজার ২০০ টন, ২০২২ সালে ১ হাজার ৩০০ টন, ২০২৩ সালে ৫৮৭ টন এবং ২০২৪ সালে ৫৭৭ টন ইলিশ ভারতে যায়। সর্বশেষ বছরে রপ্তানির পরিমাণ আরও কমে প্রায় ১৫০ টনে নেমে আসে।
অন্যদিকে চলতি বছর চিত্রটি উল্টো। গত দুই মাসে ভারত থেকে পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৫০০ টনের বেশি ইলিশ বাংলাদেশে এসেছে। এসব মাছের একটি বড় অংশ গুজরাটের ভারুচ এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া পাইকারি মাছ বাজার থেকেও কিছু ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলার বাজারে এসব ইলিশ বিক্রি হয়েছে। তাজা মাছের পাশাপাশি নোনা ইলিশ ও শুঁটকি তৈরিতেও ভারতীয় ইলিশ ব্যবহার করা হয়।
তবে সম্প্রতি ইলিশ আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত ছাড়পত্র বাতিল হওয়ায় দুই দেশের ইলিশ বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গাপূজার বাজারে এবার বাংলাদেশি ইলিশের দেখা মিলবে কি না, তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
