কেশবপুর প্রতিনিধি
দৈনিক কল্যাণ পত্রিকায় অনিয়মের খবর প্রকাশের পর কেশবপুরের খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা সুনিল মন্ডলকে বদলি করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন এ উপজেলায় থেকে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে অস্বচ্ছল নারীদের খাদ্য সহায়তার চাল ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এ উপজেলায় সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ২৯২ দশমিক ৮৬ মেট্রিকটন চালে বস্তা প্রতি এক কেজি করে কম দিয়েছেন। যার সরকারি মূল্য ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫২৮ টাকা। এছাড়াও তিনি বস্তাপ্রতি ১০ টাকা হারে মোট ৯৭ হাজার ৬২০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, খাদ্য গুদাম থেকে সরবরাহকৃত প্রতি বস্তায় ২৮ থেকে ২৯ কেজির বেশি চাল পাওয়া যায় না। চাল কম দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গুদাম কর্মকর্তা জানান, ৬ মাস আগে চাল ওজন দিয়ে বস্তাবন্দি করে রাখা হয়। যে কারণে একটু কম হতে পারে। কিন্তু সুফলভোগীরা সরকারি চাল কম নিতে চান না। এনিয়ে গরীব অসহায় নারীদের সাথে মাঝেমধ্যে বাকবিত-া হয় চেয়ারম্যান ও মেম্বরদের।
এনিয়ে ভুক্তভোগীদের বক্তব্যসহ একটি সচিত্র প্রতিবেদন দৈনিক কল্যাণে গত ০৩ মে ‘কেশবপুরে ভিজিএফ ও ভিডব্লিউবি’র চাল কম দিয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা আত্মসাৎ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে বিষয়টি। এতে বিপাকে পড়েন খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা সুনীল মন্ডল। তিনি সংবাদে উল্লেখিত দুই চেয়ারম্যানের কাছ থেকে তার পক্ষে লিখিত বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অবশেষে সম্প্রতি তার বদলি হয়েছে।
রোববার এ উপজেলার নবাগত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা হিসেবে চার্জ বুঝে নিয়েছেন মাসুদ রানা।
উল্লেখ্য, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর অস্বচ্ছল নারীদের খাদ্য সহায়তা বাবদ তাদের তালিকাভূক্ত সুবিধাভোগীদের প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল বস্তায় সরবরাহ করে থাকে। ২০২৩-২০২৪ চক্রের সরকারের ভলনারেবল উইমেন বেনেফিট (ভিডব্লিউবি) কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্র নারীদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ১১টি ইউনিয়নে ২ হাজার ৫৮৩ টি কার্ডের অনুকূলে ৭৭ দশমিক ৪৯০ মেট্রিক টন ও খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ঈদ উৎসবে প্রতিটি কার্ডধারীকে ১০ কেজি হারে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ১৬ হাজার ৯১৬ টি কার্ডের জন্যে ১৬৯ দশমিক ১৬০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়াও পৌরসভায় ৪৬ দশমিক ২১০ মেট্রিক টনসহ মোট ২৯২ দশমিক ৮৬ মেট্রিক টন বা ২ লাখ ৯ হাজার ৮৬০ কেজি চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। গত ২২ এপ্রিল ঈদুল ফিতরের আগে এসব চাল ১৯ হাজার ৪৯৯ টি কার্ডধারী দুঃস্থ অসহায় পরিবারের মাঝে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বারদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে।
সরকারের বরাদ্দকৃত চাল খাদ্য অধিদপ্তর কর্তৃক উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে ৩০ কেজি ৩শ’ গ্রাম করে বস্তায় সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা সরকারের এ নির্দেশনা মানেন না। তিনি ভিডব্লিউবি কর্মসূচি থেকে বস্তায় ১ কেজি করে মোট ২ হাজার ৫৮৩ কেজি চাল কম দিয়ে যাচ্ছেন। যার সরকারি মূল্য প্রতিমাসে ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৫২ টাকা। অনুরূপভাবে ঈদুল ফিতরের বরাদ্দকৃত ভিজিএফ কর্মসূচির ২১৫ দশমিক ৩৭০ মেট্রিকটন চালের মধ্যে প্রতি বস্তায় ১ কেজি করে কম করে ৭ হাজার ১৭৯ কেজি চাল কম দিয়েছেন। যার সরকারি মূল্য ৩ লাখ ১৫ হাজার ৮৭১ টাকা। এছাড়াও, বস্তাপ্রতি ১০ টাকা হারে নিয়ে তিনি ৯ হাজার ৭৬২ টি বস্তায় ৯৭ হাজার ৬২০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। চাল সরবরাহের শুরু থেকেই স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বার এবং সুবিধাভোগী নারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে চাল ওজনে কম পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে সাগরদাঁড়ি ইউপি চেয়ারম্যান কাজী মুস্তাফিজুল ইসলাম মুক্ত বলেন, রিপোর্ট প্রকাশের পর খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা তার পক্ষে লিখিত বক্তব্য দিতে বলেছিলেন কিন্তু সেটা আমরা দেয়নি।
উপজেলা খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা সুনীল মন্ডল বলেন, উপরের অনেক কর্মকর্তাদের উপঢৌকন পাঠাতে গিয়ে অনেক কিছু করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আপনারা রিপোর্ট করার আগে একটু সেইভাবে বললে ব্যবস্থা করতাম ।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুন্ডু বলেন, উপজেলা খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা সুনীল মন্ডলকে বদলি করা হয়েছে। চাল কমের বিষয়ে চেয়ারম্যানরা লিখিত অভিযোগ দিলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
