অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি: যশোরের শিল্পনগর হিসেবে পরিচিত নওয়াপাড়া। মূলত নৌ-বন্দরকে ঘিরে নওয়াপাড়ায় গড়ে উঠেছে বাণিজ্য কেন্দ্র। কিন্তু ভৈরব নদ নাব্যতা হারিয়েছে। এতে বড় বড় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
যেকারণে বন্দরটিতে যাতে ব্যবসায়ীরা পূর্ণাঙ্গ সুবিধা ভোগ করতে পারেন সেজন্য নেয়া হচ্ছে ৪৫ কোটি টাকার প্রকল্প। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ‘নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায় টার্মিনালসহ বন্দর সুবিধাদি নির্মাণে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি একনেকে পাশ হলে শুরু হবে উন্নয়নকাজ।
নদের প্রাণ ফেরাতে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে আন্দোলন করছেন বলে জানিয়েছেন বন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিকনেতা ফালগুন মণ্ডল। তিনি বলেছেন, ভৈরবে নাব্যতা নেই। নদের মধ্যে জেগে উঠেছে চর। নামকাওয়াস্তে চলছে ড্রেজিং, দৃশ্যমান কিছুই হচ্ছে না। নওয়াপাড়া নৌ-বন্দরে এখন জাহাজের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এমন চলতে থাকলে আগামী দু’এক বছরের মধ্যে নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর শুধু নামেই থাকবে।
যশোরের অভয়নগর উপজেলা শহর নওয়াপাড়ায় বছরে বিদেশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার আমদানি পণ্য এখানে খালাস হয়। এখান থেকে সারা দেশে যায় রাসায়নিক সার, কয়লা, খাদ্যশস্য ও পাথর। শুধু আমদানি পণ্য নয়, প্রায় হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ পণ্যের বড় বাজার নওয়াপাড়া।
যে নদ ঘিরে গড়ে উঠেছে এই ব্যবসাকেন্দ্র, সেই ভৈরব কিন্তু ধুঁকছে। দখল ও ভরাটের কারণে নদটি সরু হয়ে গেছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দাবির পরও দখলমুক্ত হচ্ছে না নদ, হচ্ছে না নিয়মিত খনন। বন্দরে ৫০০ মেট্রিক টন থেকে শুরু করে দেড় হাজার মেট্রিক টন পণ্যবাহী জাহাজ নোঙর করে। কিন্তু নাব্যতা সংকটে এখন আগের মতো জাহাজ ভিড়ে না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দু’এক বছরের মধ্যে নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর অচল হয়ে যাবে।
নাব্যতা হারিয়ে ভৈরব নদ এখন নালায় পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ জালাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘এই নৌ-বন্দরের অন্যতম সমস্যা ভৈরব নদের নাব্যতা নেই। নদের ভেতরে পলি জমে তা ভরাট হয়ে গেছে। আগে যে সংখ্যক জাহাজ ভিড়তো, এখন তার অর্ধেকে নেমে এসেছে। জেটি থেকে দুই-আড়াইশ ফিট দূরে জাহাজ ভিড়ে। বাঁশের সাঁকো তৈরি করে শ্রমিকদের দিয়ে মালামাল আনলোড করা হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে, প্রক্রিয়াও বিলম্ব হচ্ছে।
অবিলম্বে নদের পলি অপসারণে ড্রেজিং চালু ও নদের জায়গা দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে ব্যবসায়ী এনামুল হক বাবুল বলেন, ‘নদ না থাকলে এই অঞ্চলের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া অভয়নগরে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) নির্মাণ হচ্ছে। আধুনিক নৌ-বন্দরের যে প্রকল্প ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করা হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাই।
নওয়াপাড়া নৌ-বন্দরে পর্যাপ্ত ড্রেজিং ব্যবস্থা চালুর কথা উল্লেখ করেছেন যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ও আমদানিকারক মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, যেন বড় বড় জাহাজ এই বন্দরে আসতে পারে সেজন্য একটি অবকাঠামো তৈরি করা দরকার। ব্রিজের ওপাশের রাস্তার অবস্থা করুণ।
সেখানে সংস্কার ও চওড়া করে ভারী ট্রাক চলাচলের ব্যবস্থা করা না গেলে এখানকার ব্যবসার বাজার নষ্ট হয়ে যাবে। বন্দরের অবকাঠামো ও সেবার মান বাড়ালে ব্যবসায়ীরা আরও আগ্রহী হবেন। ব্যবসা-বাণিজ্য আরও বাড়বে।
ভৈরব নদে ড্রেজিং চলছে জানিয়ে নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে ড্রেজিংয়ের ফলে স্পয়েল ফেলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে ড্রেজিংয়ে ধীরগতি। নৌ-বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের স্পয়েল ফেলার জায়গার বিষয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।
ইতোমধ্যে অনেক নিচু এলাকা ভরাট হয়ে গেছে। তবে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হলে ড্রেজিংয়ের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মেশিন আনা গেলে স্পয়েল ফেলার সুবিধা হবে। নৌ-পরিবহনের মাধ্যমে মালামালের সুষ্ঠু নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ওঠানামা নিশ্চিতকরণ ও পরিবহন খাতে নৌ-পরিবহনের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ‘নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায় টার্মিনালসহ বন্দর সুবিধাদি নির্মাণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করা হয়েছে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা বাস্তবায়ন করবে বিআইডব্লিউটিএ। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৪। নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের অধীনে নিরাপদ নৌ-বার্দিংয়ের জন্য প্রায় দুই লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং, ১৮ দশমিক পাঁচ একর ভূমি অধিগ্রহণ ও দশমিক আট লাখ ঘনমিটার ভূমি উন্নয়ন, ৯ হাজার ৬০০ বর্গমিটার আরসিসি কি ওয়াল, ২২ হাজার বর্গমিটার পার্কিং ইয়ার্ড, ১২ হাজার বর্গমিটার স্লোপ প্রটেকশন নির্মাণ, ৫৪০ বর্গমিটার বন্দর ভবন, প্রায় সাত হাজার ১৬৮ বর্গমিটার মালামাল মজুত এলাকা এবং শ্রমিক বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হবে। এর ফলে নওয়াপাড়া পূর্ণাঙ্গ নৌ-বন্দর হিসেবে যাত্রা শুরু করতে পারবে।
নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায় টার্মিনালসহ বন্দর সুবিধাদি নির্মাণ প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশীদ বলেন, ‘সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাস হয়েছে। এটি একনেকে ছাড় পেলেই নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর এলাকায় টার্মিনালসহ বন্দর সুবিধাদি; বিশেষ করে নদের ড্রেজিং ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কানাডা, সৌদিআরব, মরক্কো, অস্ট্রেলিয়া থেকে বড় জাহাজে আমদানি করা সার, বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যশস্য ও কয়লা চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দরে আসে। সেখান থেকে ছোট জাহাজে তা নওয়াপাড়ায় আনা হয়। ভারত থেকে স্থলপথে আমদানি পণ্য ট্রেনে ও ট্রাকে বেনাপোল এবং ট্রেনে দর্শনা স্থলবন্দর হয়ে নওয়াপাড়ায় আনা হয়।
প্রতিদিন ৪০০-৫০০ পণ্যবোঝাই জাহাজ নওয়াপাড়ায় ভৈরব নদে অবস্থান করে। সেখান থেকে নামানোর পর এসব পণ্য প্রতিদিন স্থলপথে এক হাজারের বেশি ট্রাকে এবং নদীপথে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে দেশের উত্তর, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে নেওয়া হয়।
আর্থিক লেনদেনের জন্য এখানে আছে ১৩টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের শাখা। আছে অর্ধশতাধিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন লেনদেন হয় কয়েকশ কোটি টাকা। নওয়াপাড়ার এই ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল প্রায় তিন লাখ মানুষ।
বিদেশ থেকে আমদানি করা সারের ৩৫-৪০ শতাংশ সার নওয়াপাড়া থেকে বিপণন হয়। ধীরে ধীরে সারের সঙ্গে খাদ্যশস্য, সিমেন্ট, রড, পাথর এবং সর্বশেষ কয়লার ব্যবসা যুক্ত হয়েছে। ব্যবসা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে নওয়াপাড়ায় তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।