আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ, কেশবপুর
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন প্রার্থীরা। তবে নিশ্চিতে ভোটের প্রচারণা করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের একক প্রার্থীকে নিয়ে ভোট বাড়ানোর ছক কষে চলেছেন। সেখানে বিএনপির তিনজন নেতা ‘চূড়ান্ত সিগন্যাল’-এর অপেক্ষায় নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন ও এবি পার্টির একক প্রার্থী নিশ্চিন্তে মাঠে কাজ করছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে এখন এই প্রার্থীদের সাংগঠনিক শক্তি ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ওপরই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ।
যশোর-৬ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি সুসংগঠিত সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে একক প্রার্থী নিয়ে এগিয়ে আছে। কেশবপুর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক মুক্তার আলী এই আসনে জামায়াতের একমাত্র প্রার্থী। তিনি শুরু থেকেই এলাকায় সক্রিয়ভাবে গণসংযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। একক প্রার্থী হওয়ায় জামায়াতের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের ভিত্তিতে পূর্ণ উদ্যমে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা মাঠের কার্যক্রমে দৃশ্যমান গতি এনেছে। স্থানীয়দের মতে, তাঁর জনপ্রিয়তা ও একক সাংগঠনিক সমর্থন দলটিকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির তিন প্রভাবশালী নেতা এই আসনে দলীয় প্রতীক বা কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের ‘সিগন্যাল’-এর অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে ৩১দফার লিফলেট বিতরণ, জনসংযোগ ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হোসেন আজাদ তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত ও অভিজ্ঞ নেতা। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তৃণমূলের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন তার সহধর্মিনী রেহেনা আজাদ। যিনি কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী রওনকুল ইসলাম (শ্রাবণ) তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা এবং ছাত্রদলের সাবেক শীর্ষ নেতা হওয়ায় সাংগঠনিকভাবেও তিনি প্রভাবশালী।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু তিনি কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছেন। সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।
বিএনপির এই তিন মনোনয়ন প্রত্যাশী কেউই এখনো চূড়ান্ত মনোনয়নের নিশ্চয়তা পাননি। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মতে, প্রার্থী মনোনয়নই বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী তৎপরতার গতিপথ নির্ধারণ করবে।
এলাকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আসনে ভোটের ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করবে প্রার্থী মনোনয়নের কৌশল-এর ওপর।
জামায়াতের একক প্রার্থী যেমন তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করেছে, তেমনি বিএনপির একাধিক প্রার্থীর তৎপরতা স্থানীয় রাজনীতিতে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। জোটগত নির্বাচন হলে প্রার্থী কে হন, তা নিয়েও জল্পনা রয়েছে। দলগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার পরই এই আসনের নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার হবে এবং ভোটের মাঠের প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হবে।
এছাড়াও, কেশবপুর আসন থেকে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহমুদ হাসান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী গাজী শহিদুল ইসলাম দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রচার প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।
উপজেলা নির্বাচন অফিসার কাজী মাহমুদুল হক জানান, একটি পৌরসভা ও এগারোটি ইউনিয়ন নিয়ে যশোর-৬ কেশবপুর আসন গঠিত। এ আসনের ২ লক্ষ ২৬ হাজার ৫৫৩ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৬৭৩ জন ও মহিলা ১ লক্ষ ১২ হাজার ৮৭৮ জন। হিজরা ভোটার ২ জন । মোট ভোট কেন্দ্র ৮১ টি ও ভোট কক্ষ ৪১৫ টি।
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, এ আসনটিতে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের পীযুষ ভট্টাচার্য, ১৯৭৯ সালে বিএনপির গাজী এরশাদ আলী, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আব্দুল হালীম, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির এ্যাডভোকেট আব্দুল কাদের, ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি থেকে মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন আবারো এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ থেকে এ এস এইচ কে সাদেক এমপি নার্বাচিত হন। এরপর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে শেখ আব্দুল ওহাব, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ইসমাত আরা সাদেক এমপি নির্বাচিত হন। ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুর পর ২০২০ সালের উপ নির্বাচনে শাহীন চাকলাদার এমপি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী খন্দকার আব্দুল আজিজ এমপি নির্বাচিত হন।
ভোটাররা জানান, এবার আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। ভোট হবে বিএনপির সাথে জামায়াতের। ধানের শীষের প্রার্থী কে হবে সেটাই এখন মূল আলোচনায়। কর্মীদের ভাষ্য, মতানৈক্য, দ্বন্দ্ব- অপছন্দ থাকলেও ধানের শীষের প্রশ্নে তারা এক ও অভিন্ন, তাদের কথা যিনি পাবেন ধান, তিনি হবেন প্রাণ।
আবুল হোসেন আজাদ বলেন, আমি ২০০১ সাল থেকে কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছি। ইতিপূর্বে ২০০৮, ২০১৮ ও ২০২০ সালে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলাম। এবারের নির্বাচনেও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী। শত প্রতিকূল পরিবেশেও সব সময় নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম, আছি ও থাকবো। এছাড়াও করোনা মহামারির সময় পৌরসভাসহ ১১ টি ইউনিয়নের মানুষের পাশে থেকেছি। যথাসম্ভব খাদ্য ও সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান করেছি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক হামলা, মামলা ও নির্যাতন শিকার হয়েছেন বলেও জানান।
কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, হাইকমান্ড বলেছে কাজ করতে, আমি কাজ করছি, ধানের শীষের জন্য কাজ করছি। মনোনয়নের ক্ষেত্রে আমিও আশাবাদী। তরুণদের যে জাগরণ সারা বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, তার ধারাবাহিকতায় দল তরুণদের মূল্যায়ন করবে বলে আশা করি। তবে ধানের শীষ যিনিই পাবেন, তাকেই বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো।
অমলেন্দু দাশ অপু বলেন, ছাত্রদল থেকে শুরু করে ৪০ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত রয়েছি। ৪ বার এ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছি। আওয়ামী লীগের আমলে আমি ও আমার পরিবার অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছি। কেশবপুরের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক হিন্দু ভোট রয়েছে। হিন্দু ভোটাররাই নিরামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। দলের প্রতি আমার ত্যাগ, গত ১৬ বছরে আন্দোলন সংগ্রামে আমার ভূমিকা ও একাত্মতার কারণে আমাকে মনোনয়ন দিলে এ আসন আমি দলকে উপহার দিতে পারবো। ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিএনপি এ আসনে পাশ করতে পারেনি। মনোনয়ন পেলে এ আসন পুনরুদ্ধার করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজির কোন অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে নেই। আমি প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেলে কেশবপুরের জলাবদ্ধতা, সন্ত্রাস দমন ও শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করবো।
সর্বশেষ
- বিদ্যুৎ সাশ্রয় : সারাদেশে রাত ৮টার মধ্যে সব দোকান-শপিংমল বন্ধের সিদ্ধান্ত
- ইফার বই বিক্রয় সহকারী নজরুল কোটিপতির রহস্য কী ?
- এসএসসিতে নকল ঠেকাতে কঠোর যশোর শিক্ষা বোর্ড
- হেঁটে হেঁটে প্রধানমন্ত্রীর তদারকি
- জ্বালানিতে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার : প্রতিমন্ত্রী অমিত
- রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বাস পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, যাত্রীর উদ্ধারে অভিযান শুরু
- ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে দেশব্যাপী এক মিনিট ‘ব্ল্যাকআউট’ কর্মসূচি
- ইরান যুদ্ধে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না ট্রাম্প, খুঁজছেন বের হওয়ার পথ
