নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরে উৎসবের জোয়ার, উন্নয়নের নতুন প্রত্যাশা
বিএনপির নবগঠিত সরকারের মন্ত্রিসভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন যশোর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথের পর তাকে এ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব পাওয়ার খবর যশোরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই জেলা জুড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে।
শহরজুড়ে আনন্দ মিছিল ও উদযাপন
খবর প্রকাশের পরপরই যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা শহরের গাড়িখানায় অবস্থিত জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন। বিকেল গড়াতেই কার্যালয় প্রাঙ্গণে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়।
বিকেল ৫টার দিকে জেলা বিএনপির ব্যানারে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি গাড়িখানা রোড থেকে শুরু হয়ে দড়াটনা, মুজিব সড়ক, জর্জ কোর্ট মোড় ও মাইকপট্টি প্রদক্ষিণ করে পুনরায় দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।
মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা নতুন প্রতিমন্ত্রীর নামে স্লোগান দেন, রং ছিটিয়ে ও মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ উদযাপন করেন। অনেকে এটিকে “যশোরের গর্বের মুহূর্ত” বলে আখ্যায়িত করেন।
নেতাকর্মীদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক বার্তা
দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, “এই গুরুদায়িত্ব অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে যেমন আরও দায়িত্বশীল ও শানিত করবে, তেমনি যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।”
তারা এ নিয়োগের জন্য দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-কে ধন্যবাদ জানান এবং আশা প্রকাশ করেন যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় নতুন প্রতিমন্ত্রী কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সংগঠনিক ভূমিকা
অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী পারিবারিক ইতিহাস। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম-এর সন্তান। তরিকুল ইসলাম চারবার মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন।
পিতা জীবিত থাকাকালেই অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোর জেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুসংহত করেন।
পিতার মৃত্যুর পর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে তিনি নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন। এর ফলশ্রুতিতে তিনি বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরে ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
নির্বাচনী লড়াই থেকে বিজয়
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তিনি বিজয়ী হতে পারেননি। তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেন।
তিনি ২ লাখ ১ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. আব্দুল কাদের পান ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৬৩ ভোট। এ ফলাফলকে স্থানীয় বিএনপি নেতারা “দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের স্বীকৃতি” হিসেবে দেখছেন।
শিক্ষাজীবন ও পেশাগত পরিচিতি
১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট যশোরে জন্মগ্রহণ করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৩ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞানে ১৯৯৬ সালে বিএসসি (অনার্স) এবং ১৯৯৭ সালে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০২ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি বিতর্কচর্চায় সক্রিয় ছিলেন এবং টিভি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ফজলুল হক হলের নেতৃত্ব দেন।
পেশাগত জীবনে তিনি ল্যাবস্কান মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড ও লোকসমাজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি যশোর মেডিসিন ব্যাংক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, যশোর ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, যশোর প্রেস ক্লাব, যশোর চেম্বার অব কমার্স, যশোর ক্লাব, ঝিনাইদহ এক্স ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন, গ্রাজুয়েট বায়োকেমিস্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ বায়োকেমিক্যাল সোসাইটিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
সামনে যে চ্যালেঞ্জ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পোন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং খনিজ সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা—এসব খাতে বড় ধরনের নীতি-পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তরুণ নেতৃত্ব, উচ্চশিক্ষা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ খাতে গতিশীলতা আনতে সক্ষম হবেন। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়নে তার সরাসরি নজর থাকবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
যশোরের প্রত্যাশা
যশোরবাসীর কাছে এ মন্ত্রিত্ব শুধু রাজনৈতিক অর্জন নয়, বরং উন্নয়ন-আশার নতুন অধ্যায়। দীর্ঘদিন পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যশোরের প্রতিনিধিত্ব পাওয়ায় জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের পথচলা কতটা সফল হয়—এখন সেদিকেই তাকিয়ে যশোরসহ পুরো দেশ।
