একরাম-উদ-দ্দৌলা
তরিকুল ইসলামকে আমি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখিনি, দেখেছি একজন অসাধারণ মানবিক মানুষ, একজন আপনজন ও অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল অনেক বড়, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাঁর হৃদয়টা ছিল আরও বড়। ক্ষমতা, পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান কখনো তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি।
একসময় যশোর শহরের ঘোপে তরিকুল ইসলামের বাড়ির পাশেই ভাড়া থাকতাম। প্রায় প্রতিদিন সকালে তাঁর বাসা থেকে লোক এসে আমাকে নাস্তার দাওয়াত দিয়ে যেত। ভাবি (তরিকুল ইসলামের স্ত্রী) নানা পদের নাস্তা তৈরি করতেন। আমরা একসঙ্গে বসে নাস্তা করতাম, গল্প করতাম। রাজনীতি, সংবাদপত্র, যশোরের উন্নয়ন, দেশের পরিস্থিতি—কত বিষয়েই না কথা হতো! সেই নাস্তার টেবিলে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে ছোট্ট শিশু হিসেবে চারপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। আজ সেই অমিত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। সময় কত দ্রুত বদলে যায়!
তরিকুল ইসলাম তখন প্রথম সমাজসেবা প্রতিমন্ত্রী। একবার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নড়াইল সফরে যাওয়ার সময় সংবাদ সংগ্রহের জন্য আমাকে সফরসঙ্গী করেছিলেন। তখন আমি দৈনিক ঠিকানার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম। তাঁর সেই সফরের সংবাদটি দৈনিক ঠিকানায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছিলাম। তরিকুল ইসলামের রাজনৈতিক পথচলায় দৈনিক ঠিকানারও একটি ভূমিকা ছিল বলে আমি মনে করি।
১৯৮৫ সালে দৈনিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠার পর পত্রিকাটির প্রতি তাঁর আলাদা ভালোবাসা তৈরি হয়। বিএনপির নেতাকর্মীদের তিনি বলতেন, কল্যাণে দলের খবর দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেই লোকসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দৈনিক কল্যাণকে কখনো ভুলে যাননি। তাঁর রাজনৈতিক কর্মীদের বলতেন, ‘লোকসমাজ আমাদের দলীয় পত্রিকা, আর কল্যাণ নিরপেক্ষ। কোনো খবর থাকলে আগে কল্যাণে দেবে।’ একজন রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে সংবাদপত্রের প্রতি এমন সম্মান ও উদারতা সত্যিই বিরল।
আমাদের সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে একটি ঘটনা আজও আমার চোখে ভাসে। এরশাদের সামরিক শাসনামলে তরিকুল ইসলাম নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। নির্যাতনে তাঁর একটি দাঁত উপড়ে ফেলা হয়েছিল। সে সময় একটি দুর্ঘটনায় তাঁর একটি পা ভেঙে যায়। সেই ভাঙা পা নিয়ে এক রাতে তিনি আমাকে বললেন, ‘তুই সাংবাদিক মানুষ, তোর বাড়িতে পুলিশ যাবে না। রাতে তোর বাড়িতে থাকব।’ আমি তাঁকে নিজের বাসায় নিয়ে গেলাম। একজন রাজনৈতিক নেতা আমার ওপর এতটা আস্থা রেখেছিলেন—এটি আমার জীবনের এক বড় প্রাপ্তি। আমি স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলাম, কিন্তু তিনি কখনো আমাকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শে আসার জন্য চাপ দেননি। আমাদের সম্পর্কের জায়গায় রাজনীতির কোনো হিসাব ছিল না।
আরেকটি ঘটনা কখনো ভুলতে পারব না। রাত প্রায় ১২টা। হঠাৎ তিনি বললেন, ‘আমার ওষুধ শেষ হয়ে গেছে, চল যেতে হবে।’ আমার পরনে লুঙ্গি, তাঁর পরনেও লুঙ্গি। দুজনেই সেভাবে রিকশায় চড়ে পুরাতন পৌরসভার পাশে উত্তম ফার্মেসিতে গেলাম। ওষুধ কিনে আবার বাসায় ফিরলাম। ভাবলে আজও অবাক লাগে—একজন সাবেক মন্ত্রী, এত বড় মাপের রাজনৈতিক নেতা, অথচ কত সাধারণ ছিলেন! কোনো প্রটোকল নেই, কোনো আড়ম্বর নেই। তিনি জানতেন, আমি একটু অভিমানী মানুষ। আমার অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করতেন। এমন আন্তরিকতা ভোলার নয়।
তরিকুল ইসলাম যশোরকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন। যশোরের উন্নয়ন নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা ছিল। যশোরের করোনারী ইউনিট, কিশোর সংশোধন কেন্দ্র, মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। জেলার কোথায় কী প্রয়োজন, সাধারণ মানুষের কী সমস্যা—এসব বিষয়ে তাঁর গভীর ধারণা ছিল। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতেন, মানুষের কথা শুনতেন এবং যশোরকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
সময় পেলেই তিনি আমার অফিসে চলে আসতেন। চলত প্রাণখোলা আড্ডা। মধু সুইটসেও তাঁর সঙ্গে নিয়মিত বসতাম। সেখানে তাঁর বন্ধু খালেদুর রহমান টিটোসহ আরও অনেকে থাকতেন। সেই আড্ডায় রাজনীতি যেমন থাকত, তেমনি থাকত হাসি-আনন্দ, ব্যক্তিগত গল্প আর মানুষের সুখ-দুঃখের কথা। তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। বড় নেতা হয়েও তিনি কখনো নিজেকে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা ভাবতেন না।
তরিকুল ইসলামের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল মানুষকে আপন করে নেওয়া। তিনি কাউকে কাছে টানতে জানতেন। তাঁর এই গুণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাঁর জানাজা। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে যশোরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে এসেছিলেন। এত মানুষের ভালোবাসা এক দিনে অর্জন করা যায় না। এটি অর্জন করতে হয় সারাজীবনের মানবিকতা, আন্তরিকতা ও মানুষের পাশে থাকার মধ্য দিয়ে।
আজ তরিকুল ইসলাম নেই। সকালে আর তাঁর বাসা থেকে নাস্তার দাওয়াত আসে না। রাত ১২টায় ওষুধ কিনতে যাওয়ার সেই সঙ্গী নেই। অফিসে এসে আড্ডা দেওয়ার মানুষটিও আর আসবেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।
তাঁর যোগ্য পুত্র অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের মধ্যেও আমি বাবার মতো মানুষের ভালোবাসা অর্জনের সেই গুণ দেখতে পাই। এটি আমার ভালো লাগে।
জীবনে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, অনেক বড় বড় নেতার সঙ্গে চলেছি। কিন্তু তরিকুল ইসলামের মতো নিরহংকার, আন্তরিক ও মানবিক মানুষ খুব বেশি দেখিনি। তিনি আমার কাছে শুধু একজন সাবেক মন্ত্রী কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি ছিলেন তরিকুল ভাই—আমার আপনজন।
মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়, কিন্তু কিছু সম্পর্ক, কিছু স্মৃতি কখনো শেষ হয় না। তরিকুল ইসলাম আমার জীবনে তেমনই এক নাম। তাঁর কথা মনে পড়লে আজও মনটা ভারী হয়ে ওঠে। মনে হয়, মানুষটি যদি আরেকবার ফিরে আসতেন, আবার সেই নাস্তার টেবিলে বসে গল্প করতেন, আবার অফিসে এসে বলতেন, ‘কী রে, কেমন আছিস?’
এমন মানুষ আর তৈরি হবে কি না জানি না। শুধু মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমার প্রিয় তরিকুল ভাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।
তরিকুল ভাই, আপনি নেই—কিন্তু আমার স্মৃতিতে আপনি আজও আগের মতোই জীবন্ত।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক কল্যাণ
