তরিকুল ইসলাম বেঁচেছিলেন প্রায় ৭২ বছর। এর মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ৫৬ বছর। দীর্ঘ এই রাজনৈতিক পথচলায় জাতীয় রাজনীতিতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। এর আগে নির্বাচিত হয়েছিলেন যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত হন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য। যশোরের উন্নয়নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর শারীরিক নানা জটিলতায় চিরবিদায় নেন দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতির বটবৃক্ষখ্যাত তরিকুল ইসলাম। আজ তাঁর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে দৈনিক কল্যাণ-এর সঙ্গে প্রিয় নেতার স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচর, যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দৈনিক কল্যাণ-এর ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক তবিবর রহমান।
প্রশ্ন : তরিকুল ইসলামকে প্রথম যেদিন কাছ থেকে দেখেছিলেন, সেদিনের কোনো স্মৃতি কি আজও চোখে ভাসে?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা পারিবারিক। সত্যি কথা বলতে, আমার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কটা ছিল আসলে ভাবির। ভাবি আমাদের শ্রদ্ধাভাজন। আমরা তাঁদের বাসায় যেতাম। তখনো বিএনপি গঠিত হয়নি। একসময় ছাত্ররাজনীতি করতাম। তারপরও আমাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই সময় থেকেই যাতায়াত ছিল।
যখন তরিকুল ভাই যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন, তখন তাঁর নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নিই। ওই সময় থেকেই দেখেছি, যশোরকে নিয়ে তাঁর ভেতরে বিশেষ ভাবনা কাজ করত। যশোরকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য যে চিন্তা-চেতনা তাঁর মধ্যে ছিল, তা তাঁর কর্মকাণ্ডে ফুটে উঠেছে। পরবর্তীতে তিনি ভাইস চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই তাঁর কাজের মাধ্যমে যশোরের উন্নয়নের বিষয়টি সামনে আসে। পৌরসভা থেকে শুরু করে এক পর্যায়ে তা সারা জেলার উন্নয়নে পর্যবসিত হয়।
প্রশ্ন : রাজনীতির বাইরের মানুষ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : সত্যি বলতে, তরিকুল ভাই একজন সামাজিক মানুষ ছিলেন। দল-মতনির্বিশেষে সমাজের জন্য যাঁরা কাজ করতেন, তাঁদের তরিকুল ভাই কাছে ডাকতেন। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন। একজন মানুষকে আপাদমস্তক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন তেমনই। আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় ঠিক আছে; কিন্তু প্রকৃত অর্থে রাজনীতি যাদের জন্য, সেই মানুষগুলোকে নিয়ে তিনি ভাবতেন। এলাকা নিয়ে ভাবতেন, যশোরকে নিয়ে ভাবতেন। দল-মতনির্বিশেষে সবার সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। যশোরে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাস। তাঁদের সবার সঙ্গে তরিকুল ভাইয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল।
প্রশ্ন : দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তরিকুল ইসলামের একটি স্মরণীয় ঘটনা বলুন, যার মাধ্যমে তাঁর সততা, সাহস, অবিচলতা ও আদর্শের পরিচয় পাওয়া যায়।
দেলোয়ার হোসেন খোকন : আমার দৃষ্টিতে তাঁর যে মানবতাবোধ ছিল, মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও বেদনা তিনি যেভাবে ধারণ করতেন, তা বর্ণনাতীত। আমি যখন লোকসমাজে কাজ করি, তখন এই পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন তরিকুল ইসলাম। সে সময় যশোরে জেলবিদ্রোহ হয়েছিল। জেলবিদ্রোহ নিরসনের জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু প্রশাসন অ্যাকশনে চলে যায়। তখন গোলাগুলি শুরু হয়।
লোকসমাজের অফিস তখন কাঠেরপুলে। ওই অফিস থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি দেখেছি, তিনি হাউমাউ করে কাঁদছেন। চোখের পানিতে তাঁর বুক ভেসে যাচ্ছিল। জেলখানায় অনেক রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন, অনেক পরিচিত মানুষ ছিলেন। তাঁরাও তো মানুষ। তাঁদের ওপর গুলি হচ্ছে। এটা তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। তাঁর এই মানবতাবোধ আমি কাছ থেকে দেখেছি। স্মৃতির কোণে ঘটনাটি আজও ভেসে আছে। মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ আমি মনে করি বিরল।
প্রশ্ন : তাঁর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব কী ছিল? কীভাবে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতেন?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : তরিকুল ইসলামের মধ্যে একটা জাদুকরী শক্তি ছিল বলতে হবে। এমন গুণ সবার মধ্যে থাকে না। সব রাজনৈতিক নেতা কর্মীবান্ধব হন না। তিনি এমন একজন কর্মীবান্ধব নেতা ছিলেন, যাঁর সঙ্গে একেবারে তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের সম্পর্ক ছিল। অনেক রাত পর্যন্ত সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করতেন। তাঁর কথায় নেতাকর্মীরা একসঙ্গে চলতেন, যা এখন কঠিন হয়ে গেছে।
তিনি বেঁচে থাকতে এক কথায় সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে পারতেন। শুধু দলের রাজনীতি নয়, জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দল-মতের মানুষকেও এক জায়গায় নিয়ে আসতেন। জেলার স্বার্থে, মানুষের প্রয়োজনের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার বিশেষ গুণ তাঁর মধ্যে ছিল।
প্রশ্ন : রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কারাবরণ ও নির্যাতনের কঠিন সময়ে তিনি কীভাবে মনোবল ধরে রাখতেন এবং কর্মীদের সাহস দিতেন?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : তাঁর সংগ্রামী জীবনের যতটুকু দেখেছি, তাতে তিনি অত্যন্ত সাহসী মানুষ ছিলেন। ধৈর্যের চরম পর্যায় পর্যন্ত তাঁকে দেখেছি। তাঁর ওপর যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তা তিনি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। আইয়ুব খানের আমল থেকেই তিনি জেল খেটেছেন। বারবার জেলে গেছেন, বের হয়ে আবার সক্রিয় হয়েছেন রাজনীতিতে। সবাইকে নিয়ে রাজপথে থেকেছেন।
এরশাদের সময় (প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) তাঁকে যে নির্যাতন করা হয়েছিল, আপনারা জানেন, তাঁর দাঁত উপড়ে ফেলা হয়েছিল। কনডেম সেলে নিয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছিল না। এত কিছুর পরও ওই সময় যাঁরা তাঁর সঙ্গে কারাগারে ছিলেন, তাঁদের মুখে শুনেছি, তিনি নিজেই অন্যদের সাহস দিতেন। সেই অদম্য সাহস নিয়েই তিনি বেঁচে ছিলেন।

প্রশ্ন : নেতাকর্মীদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ বা অভিভাবকসুলভ আচরণের বিশেষ কোনো স্মৃতি আছে?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : এ ধরনের স্মৃতি প্রচুর আছে। মানুষের প্রতি, নেতাকর্মীদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার অনেক চমৎকার স্মৃতি রয়েছে। তিনি যখনই মন্ত্রী হয়েছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, তখনই মানুষের জন্য কাজ করেছেন। এই যশোর জেলার বহু মানুষ তাঁর হাত ধরে চাকরি পেয়েছেন। মানুষের জন্য, এলাকার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকীর্ণতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি মানুষকে ভালোবেসেছেন, মানুষের জন্য কাজ করেছেন।
আমার একটি স্মৃতি মনে পড়ে। তখন বিএনপি ক্ষমতায়, ১৯৯১ সালের পরের কথা। প্রথমে তিনি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, পরে পূর্ণমন্ত্রী হন। সে সময় এখানকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন শার্শার তবিবর রহমান সরদার। তিনি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিও ছিলেন। তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসার জন্য টাকা ছিল না। ভারতে চিকিৎসার জন্য যাবেন। তরিকুল ভাই তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন।
আমি দেখেছি, একসময় মাগুরায় বাড়ি ছিল, জাতীয় সংসদের হুইপ ছিলেন—এমন একজন ব্যক্তির চিকিৎসার জন্যও তরিকুল ভাই অর্থসহায়তা করেছিলেন।
তরিকুল ভাইকে দলের লোক আর কে দলের লোক নন, তা দেখতেন না। তিনি যেকোনো বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়াতেন এবং তাঁদের জন্য কাজ করতেন। এটা আসলেই বিরল। আজকাল এ ধরনের নেতা পাওয়া যায় না। এ কারণেই আমি তাঁকে মনে-প্রাণে স্মরণ করি। এ রকম নেতা বারবার জন্ম নেন না।
যদিও তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি বর্তমান প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও পিতার মতো মানুষের জন্য কাজ করছেন। যেকোনো বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকছেন।
প্রশ্ন : রাজনৈতিক আদর্শ ও নীতির প্রতি তিনি কতটা আপসহীন ছিলেন?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : তিনি সারাজীবনই আপসহীন ছিলেন। দেখেন, কত নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন। জেল খেটেছেন, অত্যাচারিত হয়েছেন, কনডেম সেলে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। কিন্তু তিনি আপস করেননি। যদি আপস করতেন, তাহলে জাতীয় পার্টির আমলে তাঁকে মন্ত্রী হওয়ার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তা গ্রহণ করতে পারতেন। তিনি মন্ত্রী হতে পারতেন। কিন্তু কোনো সময় তাঁকে কোনো প্রলোভনে পড়তে দেখিনি।
প্রশ্ন : দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ-সংকট বা কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতেন?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : তিনি খুব সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন। যখন যেরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, তখন সেরকম সিদ্ধান্তই নিতেন। সে জন্য আমি দেখেছি, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যখন মারা গেলেন, তখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ ছিলেন। তখন একটি সংকট দেখা দেয়। দলের মধ্যে সংকট সৃষ্টি হয়। সে সময় তরিকুল ইসলামসহ কয়েকজন বেগম জিয়াকে বিএনপির চেয়ারপারসন হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন।
পরবর্তীতে বেগম জিয়া যখন বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন, তখন বিভিন্ন সংকটে ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তরিকুল ইসলামকে ডাকতেন। তিনি সঠিক পরামর্শ দিতেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তরিকুল ভাইয়ের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ হয়েছে।
প্রশ্ন : যশোরের উন্নয়নে তরিকুল ইসলামের অবদান কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : যশোরের মানুষই তাঁর মূল্যায়ন করেন। আপনি যেখানে যাবেন, যে পথে হাঁটবেন, উন্নয়ন বলতে যা দৃশ্যমান দেখবেন, তার অধিকাংশই তরিকুল ইসলামের হাত ধরে হয়েছে। তরিকুল ইসলামকে যশোরের মানুষই ‘উন্নয়নের কারিগর’ উপাধি দিয়েছেন।
আমার দীর্ঘ স্মৃতিপটে অনেক তথ্য রয়েছে। একটা সময় বিদ্যুৎ ছিল না, রাস্তাঘাট ছিল না। আমি তাঁর সঙ্গে থাকতাম। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে রাস্তা দেখতেন। নিজেই পরিকল্পনা করতেন, কীভাবে এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়নে রাস্তা করা যায়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি রাস্তা করে দিতেন। বিদ্যুতায়নের জন্য চেষ্টা করেছেন। একপর্যায়ে মন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি যশোর জেলার সর্বত্র বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন। এতে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে যায়। এটা যশোরে আর কেউ করতে পারেননি।
প্রশ্ন : যশোরের উন্নয়নে তাঁর অসমাপ্ত কোনো স্বপ্নের কথা যদি থাকে?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : তরিকুল ইসলাম যশোরের উন্নয়ন নিয়ে সব সময় ভাবতেন। তিনি দেখেছেন, অসংখ্য মানুষ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলেও যশোরে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। তাঁদের ঢাকায় পাঠানো হতো। বেগম খালেদা জিয়া যখন সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তাঁকে বলে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ‘করোনারি কেয়ার ইউনিট’ চালু করেন। এখানে এনজিওগ্রাম হবে, হার্টে রিং স্থাপন করা যাবে—এটাই ছিল তাঁর অন্যতম স্বপ্ন।
এ লক্ষ্যে এখানে ভবনও রয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতিও এসেছিল। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় না থাকায় গত ১৬ বছরে কাজটি আর এগোয়নি। কিছু যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে। এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাহেব এই অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন। আশা করা যায়, আগামী বছরের জুনের মধ্যে করোনারি কেয়ার ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।
প্রশ্ন : তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এমন কোনো সিদ্ধান্ত ছিল কি, যেটি প্রথমে বিতর্কিত বলা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : এ রকম সুনির্দিষ্ট অনেক ঘটনা আছে। আমাদের অ্যাডভোকেট এনামুল হক ভাই ছিলেন ন্যাপের সভাপতি। খালেদুর রহমান টিটো ছিলেন, আলী রেজা রাজু ছিলেন। রাজু ভাই পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে চলে গেলেন। তাঁরা এক জায়গায় বসে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অনেকে মনে করতেন, সিদ্ধান্তটি ঠিক হলো কি না। কিন্তু পরে দেখা গেছে, তরিকুল ভাইয়ের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল।
প্রশ্ন : রাজনীতিবিদ তরিকুল ইসলামের শূন্যতা পূরণ হয়েছে কি?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : সত্যি কথা বলতে, তরিকুল ইসলামের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। আরেকজন তরিকুল ইসলাম তৈরি হতে সময়ের ব্যাপার। তাৎক্ষণিকভাবে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে তাঁর সহধর্মিণী নার্গিস বেগম ভাবি আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে একটি জায়গায় ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র অনিন্দ্য ইসলাম অমিত হাল ধরেছেন। তিনি এমপি হয়েছেন। আল্লাহর রহমতে মন্ত্রীও হয়েছেন। পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করছেন। এই এলাকার উন্নয়নের ধারাকে আবার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে দলকে আরও সুসংগঠিত করার চেষ্টা করছেন।
তিনি এখন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত)। তরিকুল ভাই যেমন শুধু যশোরের নয়, সারা বাংলাদেশের নেতা ছিলেন, তাঁর সন্তানও একইভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন : তাঁর আদর্শ ও দর্শন এ সময়ে কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাঁর যে আদর্শ ও দর্শন ছিল, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবাই এখন নিজের সুবিধা ও আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা নিয়ে ব্যস্ত। এখান থেকে বেরিয়ে সবার দেশের জন্য এবং আপামর জনগণের জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
রাজনীতিতে বক্তৃতা সবাই দেন। কিন্তু তরিকুল ভাই যে মানসিকতা ও আন্তরিকতা নিয়ে মানুষের জন্য কাজ করতেন, তা এখন কম দেখা যায়। বিশেষ করে বিগত ক্ষমতাসীনদের মধ্যে তো সামান্যতমও ছিল না। তারা লুটপাট করেছে, অর্থ পাচার করেছে, মাফিয়া বাহিনী তৈরি করেছে—এসব করেছে। কিন্তু জনগণের জন্য কাজ করার সেই মানসিকতার অভাব ছিল।
তবুও তাঁর কারণে জাতীয়তাবাদী দলের মধ্যে এখনো সেই মানসিকতার মানুষ আছেন এবং তাঁরা সেই আদর্শ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। একজন তরিকুল ইসলাম যা করতে পেরেছেন, এখন আমরা একশ মানুষ মিলে তা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু তরিকুল ইসলাম যেভাবে সফলতা অর্জন করেছেন, আমরা সেভাবে হয়তো পারিনি। তবে ইনশাআল্লাহ, তাঁর আদর্শকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা সবাই মিলে কাজ করছি।
প্রশ্ন : তাঁর অবদান ও স্মৃতি সংরক্ষণে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : আসলে মানুষের হৃদয়েই তরিকুল ইসলামের স্মৃতি রয়েছে। যশোরের ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, করোনারি কেয়ার ইউনিট, যশোর মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতাল—যেটি প্রতিমন্ত্রী অমিত ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে উদ্বোধন করিয়েছেন—এটি তরিকুল ভাই একনেকে পাস করিয়েছিলেন। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শিশু হাসপাতাল—যেদিকে তাকাবেন, সেখানেই তরিকুল ভাইয়ের অবদান রয়েছে। এসব স্থাপনার সঙ্গে মিশে রয়েছে তাঁর স্মৃতি।
প্রশ্ন : আপনার প্রতি তাঁর রাগ, অভিমান কিংবা শাসনের বিশেষ কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?
দেলোয়ার হোসেন খোকন : তিনি সোজাসাপ্টা কথা বলতেন। আমার কোনো ভুল হলে সবার সামনে বলতেন। আমার মনে আছে, টাউন হল ময়দানে একটি সভা হচ্ছিল। সে সময় আমাদের চারদলীয় জোটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভাটি আমি পরিচালনা করছিলাম। সামান্য একটি ভুল করেছিলাম। তিনি আমাকে একটি চড় মেরেছিলেন। যাঁদের তিনি এভাবে শাসন করেছেন, তাঁদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে ভালো অবস্থানে গেছেন। আমি নিজেও তার প্রমাণ।
