রুহুল আমিন
যশোরে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে। জেলার আট উপজেলায় ২৮৪ কমিউনিটি ক্লিনিকে ছয়মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ নেই। ওষুধ শূন্য থাকায় ক্লিনিকগুলো অচল হওয়ার পথে। এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরত হেলথকেয়ার প্রোভাইডারদেরও (সিএইচপি) কাজ নেই বললেই চলে। রোগীদের উপস্থিত বুদ্ধি, পরামর্শ দিয়েই অফিসিয়ালি সময় পার করছেন তারা। ওষুধ না পেয়ে ভুক্তভোগীরা রাগে, ক্ষোপে দিন দিন ক্লিনিক বিমুখ হয়ে যাচ্ছেন।
সাধারণ মানুষের দাবি, ছয় মাস ধরে জেলার ২৮৪ কমিউনিটি ক্লিনিক ওষুধ শূন্য হয়ে পড়েছে। যার ফলে, কয়েক লাখ মানুষ সেবা পাচ্ছে না। অথচ এক সময়ে গ্রামে বা পাড়া-মহল্লায় অবস্থানরত কমিউনিটি ক্লিনিকে নিমিষেই প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যেত। ওধুষ সরবরাহ না থাকায় সেই সেবা নিতে যেতে হচ্ছে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ভেঙ্গে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ক্লিনিকগুলো অচল হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রাম-গঞ্জের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করার জন্য যশোরের আট উপজেলায় ২৮৪ টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সেখানে প্রতিনিয়ত রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করার জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক পরামর্শ ও ওষুধ দেয়া হতো। ওধুষ সংকটের জন্য ছয়মাস ধরে রোগীদের ওষুধ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জ্বর, আমাশয়, গ্যাস, ব্যাথা, সর্দি, কাঁশি, চুলকানি, দাউদ, এলার্জি, ক্যালশিয়াম, আইরন, জিংক, বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিকস ও প্রেসারসহ ২২ ধরণের প্রকারের ওষুধ সরবারহ করা হতো। ওইসব ওষুধের মধ্যে ছিলো এন্টারসিড ট্যাবলেট, ক্লোরফেনিরামিন মেলিয়েট ট্যাবলেট, ফেরাস ও ফলিক এসিড, সালবিউটামল ট্যাবলেট, অ্যালবেন্ডাজল ট্যাবলেট, বেনজেয়িক ও স্যালিসাইলিক এসিড অয়েন্ট, ক্লোরামফেনিক আই ড্রপ, জেনশন ভায়োলেট, হায়োসিন বিউটাইল ব্রোমাইড ট্যাবলেট, ওয়াল রিহাইন্ড্রেশন সল্ট, সানবিউটামল সিরাপ, বেনজাইল বেনজোয়েট অ্যাপ্লিকেশন, ক্যালসিয়াম ল্যাকটেইট ট্যাবলেট, ক্লোরফেনিব্যামন মেলিয়েট সিরাপ, নিওমাইসিন অ্যান্ড ব্যাসিট্রাসিন স্কীন অয়েন্টমেন্ট, প্যারাসিটামল সাসপেনশন, এমলোডিপাইন ট্যাবলেট, মেটফরমিন ট্যাবলেট, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ট্যাবলেট, জিঙ্ক ডিসপার্সিবল ট্যাবলেট ও প্যান্টোপ্রাজেল ট্যাবলেট। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পর থেকে এসব ওষুধের মধ্যে কোন আইটেমই সরবারহ নেই। ওষুধের অভাবে ক্লিনিকগুলো অচল হওয়ার পথে। প্রতি তিন মাস পর পর এসব ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ হতো। রোগীদের চাহিদার উপর ভিত্তি করে উপজেলা থেকে ওষুধ পাঠানো হতো। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে হঠাৎ করেই কোন কারণ ছাড়াই ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। তারপর উপজেলা থেকে ওষুধের চাহিদা নেয়া হয়েছে কিন্তু ওষুধ সরবরাহ করা হয়নি।
রহিম সরদার। পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তার বাড়ি যশোরের চৌগাছা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের মল্লিকপাড়ায়। তিনি বলেন, ‘তার গ্রামে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। সেখান থেকে তিনি প্রতিমাসে প্রয়োজনীয় ওষুধ নিতেন। গত ছয়মাস ধরে ক্লিনিক থেকে কোন ধরণের ওষুধ পাচ্ছেন না। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার এলার্জির ওষুধ নিতে এসেছিলেন তিনি। ক্লিনিকের হেলথকেয়ার প্রোভাইডার তাকে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন’।
আমেনা খাতুন (১৭)। বাবা আতিয়ার রহমান। তার বাড়ি সদর উপজেলার কাঠামারা গ্রামে। গত ছয়মাস আগে তার বাবা মারা গেছেন। মা আর আমেনা খাতুন দুজন মিলে তাদের সংসার। আমেনা খাতুন খাজুরা মির্জাপুর মহিলা কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তিনি বলেন, ‘কাঠামার গ্রামে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। জ্বর, সর্দি, কাশি কিংবা অন্য কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে কমিউনিটি ক্লিনিকে ছুটে যেতেন। ক্লিনিকের হেলথ প্রোভাইডার সবকিছু শোনার পর প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতেন। গত ছয়মাস ধরে ক্লিনিকটি ওষুধ শূন্য হয়ে পড়েছে। তার মত ওই গ্রামের শত শত ওষুধ পাচ্ছেন। সেইজন্য সাধারণ মানুষের ক্লিনিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন’।
একই গ্রামের আকরাম বিশ্বাসের স্ত্রী রোজিনা বেগম বলেন, ক্লিনিকে কয়েক মাস ধে ওকান ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। ওষুধ পেলে তার মতো গরিব মানুষের খুবই উপকার হতো। তার কোন সন্তান নেই। স্বামীও একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। ইনকাম করার মতো ওকউ নেই। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধের ভারসা কমিউনিটি ক্লিনিক। ক্লিনিকে ওষুধ না থাকায় তার বিপদের শেষ নেই।
বাঘারপাড়ার নারিকেলবাড়িয়ার হেমন্ত সরকার বলেন, ‘গত দুইদিন ধরে তার পরিবারের সবাই সর্দি-জ¦রে আক্রান্ত। ওষুধ নিতে ক্লিনিকে এসেছিলেন। ওষুধ না থাকায় খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। সরকারি ওষুধ পেলে তার অনেক উপকার হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিউনিটি ক্লিনিকের কয়েকজন হেলথকেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচপি) বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকে তারা রোগীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরামর্শ ও ২২ ধরণের ওষুধ দেন। গত ছয়মাস ধরে যশোরের কোন ক্লিনিকে ওষুধ সরবারহ নেই। রোগীরা প্রতিনিয়ত ওষুধ নিতে ক্লিনিকে আসছেন। ওষুধ শূন্য থাকায় সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। রোগীদের কাছে জবাব দিতে দিতে তারাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। সরকারের কাছে তাদের দাবি দ্রুতই ওষুধ সরবারহ করে ক্লিনিকগুলো সচল করা হোক।
এ ব্যাপারে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ‘গত ছয়মাসের বেশি সময় ধরে কমিউনিটি ক্লিনিক ওষুধ শূন্য হয়ে পড়েছে, ঘটনাটি সত্য। ওষুধ কেনার খাতগুলোতে টাকা নেই। সেইজন্য মূলত এই সমস্যা হচ্ছে। ওষুধ ক্রয় করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করছি, মে মাসের শেষের দিকে ক্লিনিকগুলো ওষুধ সরবরাহ করা হবে।
