অবৈধ দেড় শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ না হওয়ায় সুফল নিয়ে সংশয়
নিজস্ব প্রতিবেদক: অবশেষে যশোরের ভৈরব নদ খননকাজ শুরু হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে এই খননকাজ শুরু করে ঠিকাদার। এর আগে ৬ষ্ঠ দফায় নতুন করে দরপত্র আহবান করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রায় ১০ কিলোমিটার খনন করতে হবে চলতি বছরের জুনের মধ্যে। তবে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এখনও করা হয়নি। শহরের মধ্যে দেড় শতাধিক অবৈধ স্থাপনা ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে। যে কারণে শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানায় খনন কাজের সুফল নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ভৈরব নদের নাব্যতা ফেরানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত অনুযায়ী ২০১৬ সালে ২৭২ কোটি টাকার একটি খনন প্রকল্প গ্রহণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। শুরু হয় পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’। এ প্রকল্পের আওতায় ৯২ কিলোমিটার নদ খনন করা হবে।
পাউবো সূত্র মতে, ভৈরব নদ খনন প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের ২০ জুন শেষ হয়। এরপর দুই দফায় সময় বাড়ানো হয়। বর্তমানে ২০২২ সালের ২২ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু শহর ও শহরতলীতে এখনো বাকি রয়েছে প্রায় ১০ কিলোমিটার খনন কাজ। এর মধ্যে শহরের নীলগঞ্জ থেকে দড়াটানা হয়ে বিরামপুর পর্যন্ত খননের জন্য পাঁচ দফা দরপত্র আহবান করা হয়। এ সময় ১১ কোটি ১৬ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৫ টাকা ব্যয়ে এ কাজ পায় মেসার্স এসএস এন্ড এমটি (জেভি)। তাদের কাজের মেয়াদ জুনে শেষ হলেও ধীরগতির কারণে শেষ হয়নি।
পাউবো যশোরের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেসার্স এসএস এন্ড এমটি (জেভি)’র কার্যাদেশ বাতিল করে ৬ষ্ঠ দফায় দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এতে কাজ পেয়েছে লিটন লিটন ট্রেডার্স, এসএম ইন্টার ন্যাশনাল ও উন্নয়ন ন্যাশনাল।
পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহীদুল ইসলাম বলেন, মেসার্স এসএস এন্ড এমটি (জেভি) নামে ঠিকাদারের ২০২১ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কাজের ধীরগতির কারণে ওই ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এতে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। ইতিমধ্যে চলতি মাসে শহরের নীলগঞ্জ থেকে খনন কাজ শুরু হয়েছে। আশা করছি আগামী জুন মাসের মধ্যে শহরের ১০ কিলোমিটার খনন কাজ শেষ হবে।
এদিকে, শহরের বাবলাতলা সেতু থেকে নীলগঞ্জ সেতু পর্যন্ত চার কিলোমিটার নদের তীরের অধিকাংশ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়নি। শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা সেতু ও কাঠেরপুল সেতুর পাশে গিয়ে দেখা গেছে, এ অংশে নদের দুই তীরে অন্তত সাতটি বহুতল ভবন রয়েছে। এছাড়া অন্তত ৩০টি স্থাপনার আংশিক অংশ ও সীমানা প্রাচীর নদের জায়গার মধ্যেই রয়েছে, যা উচ্ছেদ করা হয়নি। দড়াটানা সেতুর পশ্চিমাংশের ৮৪টি স্থাপনা উচ্ছেদ করায় নদের প্রস্থ এখন ২২০-২৫০ ফুট। কিন্তু পূর্বাংশে উচ্ছেদ না করায় প্রস্থ ১৭০-১৯০ ফুট।
এ বিষয়ে পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহীদুল ইসলাম বলেন, দখলদার উচ্ছেদ বিষয়ে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কথাবার্তা চলছে। তালিকাও হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যশোর শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদের তীরের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ অভিযান হঠাৎ থমকে যায়। দেড় বছর আগে শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা সেতুর পশ্চিমপাশের ৮৪টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হলেও পূর্বপাশের দেড় শতাধিক অবৈধ স্থাপনা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। এ অংশে নদের তীরে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বহুতল ভবনে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শহরাংশে ভৈরব নদের তীরে সৌন্দর্যবর্ধন ও শহরবাসীর পায়ে হাটার জন্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় থেকে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য নদের তীর সরেজমিনে গিয়ে ওই টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দেন। ওই টাকায় প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির কাজ করছে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)।
এ ব্যাপারে এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আনিছুজ্জামান বলেন, ‘ভৈরব নদের পাঁচ কিলোমিটারের দুই তীরে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যে ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে।
ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ভৈরবনদকে বাঁচাতে অবশ্যই এর দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। তানাহলে নদ তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবে। এক সময় ভৈবর নদ ছিল যশোর শহরের প্রাণ। দখল এবং দূষণে প্রমত্তা ভৈরব এখন মরা খাল।