রায়হান সিদ্দিক: ‘পচা নোংড়া পানিতে গা হাত পায় ঘা হয়ে গেছে। আমাদের কথা ভাবার কেউ নেই।’ আমরা গরীব মানুষ এখানে যারা থাকি কেউ রিক্সা চালায়, কেউ ভ্যান টানে আর কেউ বাসাবাড়িতে কাজ করে। পনেরো দিন বৃষ্টি বাদলা ছাড়াই আমরা পানির তলে ডুবে আছি। কার কাছে যাবো কিডা শোনবে আমাদের কষ্টের কথা!
কান্নাজড়িত কন্ঠে এভাবেই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন ৬০ বছর বয়সি বৃদ্ধা জোহরা বেগম। তিনি যশোর শহরের আরবুপুর গোড়াপাড়া গুলজান সিটির বাসিন্দা। মানবসৃষ্ট এই জলাবদ্ধতায় এখানে অমানবিক জীবনযাপন করছেন দশটি পরিবার।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী চলতি মাসের শুরু থেকে ৮ জুন পর্যন্ত যশোরের তাপমাত্রা ছিলো ৩৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে ৩৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত। এ সময় বৃষ্টি হয়েছে মাত্র একদিন। বৃষ্টির পরিমাণ ছিলো ২ মিলিমিটার। এই পরিমান বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কোন প্রশ্নই যেখানে আসে না সেখানে শহরের মাঝে কিভাবে সৃষ্টি হলো এই জলাবদ্ধতা!
ভুক্তভোগী বাসিন্দা আব্দুল গফফার বলেন, পুলিশ লাইনের পুকুর ভরাট করতে যেয়ে প্রশাসন আমাদের পানির তলে ডুবিয়ে দেচ্ছে। বারবার বলার পরও তারা কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এদিকে আমরা পরিবার সন্তান নিয়ে বিপাকে পড়েছি। আমাদের বাথরুম, রান্নাঘর সবকিছু পানিতে তলিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর বিষাক্ত সাপ-পোক ঢুকে পরে। ঘর থেকে বের হওয়ার কোন অবস্থা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ময়না খাতুন বলেন, ‘ভরা বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতা হয় মেনে নেয়া যায়। কিন্তু এই শুকনোর সময়ও আমাদের পানির তলে ডুবে থাকতি হচ্ছে। পানির কারনে আমাদের সন্তানরা ঠিকমত স্কুলে যাতি পারছে না। এই নোংরা পানির ভেতর ওর শিক্ষক পড়াতিও আসতি চাচ্ছে না। আর রাতের বেলা তো আমাদের সাপ মারার জন্যি বসে থাকতি হয়। আমরা গরীব বলে কি আমাদের জীবনের কোন দাম নেই!
ফরিদা বেগম বলেন, পানিতে বাথরুম ভরে গেছে রাতবেরাত বাইরে বের হতে পারছি না। রান্না ঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারনে অনেকটা অনাহারেই জীবন যাপন করতে হচ্ছে আমাদের। তিনি জানান, ওই এলাকার রিক্সা চালক মতির ইঞ্জিন চালিত রিক্সার মটর জ্বলে গেছে পানির জন্য। একমাত্র আয়ের সম্বল নষ্ট হওয়ায় বিপাকে পরেছিলেন তিনি। পরে একটি এনজিও থেকে সাত হাজার টাকা লোন নিয়ে আবার মটর লাগিয়েছেন। এই দুর্ভোগ থেকে কবে কিভাবে উত্তরণ হবে তা তাদের জানা নেই।
বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, চারধারের নোংরা পানি থৈ থৈ করছে। আর তার ভেতরেই একদল ছেলে মেয়ে খেলা করছে। একজন মা তার সন্তানকে বারবার নোংরা পানি থেকে উঠতে বললেও সে উঠছে না। এদিকে এই পানির কারণে চর্মরোগ হয়েছে। তিন সন্তানের মা আকলিমার তিনটি সন্তান পিঠা পিঠি হওয়ায় কাউকেই ঠিকমতো সামলাতে পারেনা। তিনি বলেন, আজ দুই সপ্তাহ ধরে আমরা এই নোংরা পানির ভেতরেই বসবাস করছি। রান্নাঘর, বাথরুম সব পানিতে তলিয়ে গেছে। আর বাচ্চাদের কোনভাবে এই নোংরা পানি থেকে দূরে সরায় রাখতি পারছিনে। একটু চোখের আড়াল হলি পানির ভেতর নেমে পড়ছে। আমাদের এই কষ্ট দেখার কেউ নেই। প্রশাসন, পৌরসভা সব জায়গায় গেছি কোন লাভ হয়নি। আমরা গরীব মানুষ তাই আমাদের জীবনেরও কোন মূল্য নেই।
শহরের পুরাতন কসবা আজিজ সিটির নিচের অংশে ভৈরব নদ থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে পুলিশ লাইনের ভেতরে পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। সেখান থেকেই পানি বের হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ইতোমধ্যে বালি উত্তোলন বন্ধের জন্য ‘জনউদ্যোগ’ বুধবার যশোরের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক হুসাইন শওকতের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। আরবপুর গোড়াপাড়া গুলজান সিটি পুলিশ লাইনের পেছনের অংশ।