সুনীল ঘোষ: বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট এখন আর নেই। বোতল নিয়ে ছুটোছুটির দিনও শেষ। পানি কিনতে ছুটতে হচ্ছে না দোকানে। যে কেউ হাত বাড়ালেই পাচ্ছেন সুপেয় পানি। তাও একদম ফ্রিতে। এচিত্র যশোর জেনারেল হাসপাতালের। এ কৃতিত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের না। না কোনো প্রশাসন বা রাজনীতিক-জনপ্রতিনিধির। পুরো কৃতিত্ব জাইকা ও এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের। এর সুফল ভোগ করছেন দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ। বেশি উপকৃত হচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ। অকপটে স্বীকারও করেছেন অনেকে।
হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে জরুরি বিভাগের দিকে এগিয়ে যেতেই নজরে পড়ে দৃষ্টিনন্দিত পানির স্থাপনা। করোনারি কেয়ার ইউনিটের পশ্চিমে ও বহিঃবিভাগ এবং রোগী কল্যাণ সমিতি ভবনের পূর্ব পাশে ইট-বালু দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে টেবিল আকৃতির স্থাপনা। নজরকাড়া টাইলস’র চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে ইট-বালু। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় ৩টি ট্যাপ রয়েছে। দিন-রাত সারাক্ষণ ট্যাপ থেকে পানি নিচ্ছেন।
সপ্তাহ খানেক আগের কথা। বেলা তখন সকাল ১১ টা। একজনকে হন্ত-দন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখা যায় হাসপাতাল ক্যাম্পাসে। তিনি ছুটে যান ট্যাপের দিকে। ব্যাগের বোতল বের করে ট্যাপ থেকে পানি নিয়ে পান করেন। নাম-পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, বাড়ি শহরের শংকরপুরে। তিনি বলেন, বোতলজাত পানির চেয়ে এই ট্যাপের পানি অনেক নিরাপদ। হাসপাতালে আসলে তিনি এখান থেকে পানি নিয়ে তৃষ্ণা মেটান। এ সময় অনেক নারী-পুরুষকে ট্যাপে বোতল পেতে পানি নিতে দেখা যায়।
এ সময় মোটরসাইকেল হাকিয়ে আসা এক ব্যক্তিকে ট্যাপের পানি পান করতে দেখা যায়। নাম-পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, নাম গফফার। পেশায় মাদ্রাসা শিক্ষক। তিনি বলেন, বোতলজাত পানির চেয়ে এই ট্যাপের পানির স্বাদ ভাল।
‘এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ, যশোরে কর্মরত ওয়াটার সাপ্লাই ইঞ্জিনিয়ার জয়নুল আবেদিন জানান-শুধু যশোর জেনারেল হাসপাতালেই না, বিশুদ্ধ ও সুপেয় খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে জেলার সবক’টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। প্রত্যেকটি হাসপাতালে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট ছিল। দৈনিক কল্যাণসহ বিভিন্ন গণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবাদ দেখে সংকট উত্তরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি’র (জাইকা) অর্থায়নে যশোরের সব হাসপাতাল ক্যাম্পাসে স্থাপন করা হয়েছে সাব-মারসিবল। ট্যাঙ্কি খালির সুযোগ নেই। অটোমেটিক চালু হয় মটর। ট্যাঙ্কির ময়লা পরিস্কারেও ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। তিনি বলেন, প্রতিটি সাব-মারসিবল স্থাপনে ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। যশোর জেনারেল হাসপাতালে নতুন করে বোরিং করতে ব্যয় হয়েছে আরও ৩৫/৪০ হাজার টাকা। জাইকা প্রকল্পের পুরো অর্থ দিয়েছে।
এক প্রশ্নোত্তরে তিনি বলেন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন অন্তত ৪শ’ রোগী ভর্তি থাকেন। আসেন স্বজনরাও। কিন্তু তাদের সবাই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না। অনেকেই গরীব, অসহায় ও সীমিত আয়ের মানুষ। বিত্তবানের সংখ্যা একদমই কম। চিকিৎসা খরচ মিটিয়ে গরীবের পক্ষে বোতলজাত পানি কিনে খাওয়া দুঃস্বপ্নের মতো। তিনি বলেন, প্রতিদিন কমপক্ষে ৮শ’ মানুষ আর্সেনিকমুক্ত পানি নিচ্ছেন। কিনতে হচ্ছে না বোতলজাত পানি। ছুটতে হচ্ছে না এদিক-ওদিক বা দূর-দূরান্তে। এক কথায় যশোরের হাসপাতালগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট কেটে গেছে। হাসপাতালে আসা মানুষ হাত বাড়ালেই পাচ্ছেন পানি। ৩০ জানুয়ারি থেকে এই বিশুদ্ধ খাবার পানি পাচ্ছেন হাসপাতালে আসা মানুষ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, যশোর জেনালে হাসপাতালে ৮টি টিউবওয়েল রয়েছে। প্রায় সময় ৫টি থাকে অকেজো। ৩টি সচল থাকলেও আর্সেনিকমুক্ত না। বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করে মিলেছে অত্যাধিক আয়রণ ও আর্সেনিক। যে কারণে বিত্তবানরা বোতলজাত পানি কিনে খেতেন। গরীব-দুখি ও অসহায় মানুষ ছিলেন চরম বিপাকে। বোতল নিয়ে ছুটতেন এদিক-ওদিক। চিকিৎসার খরচ মিটিয়ে পানি কিনে খাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। খাবার পানির এই তীব্র সংকট থেকে উত্তরণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ ছিল না। কোনো রাজনীতিক বা জনপ্রতিনিধিও এগিয়ে আসেননি। বিষয়টি ‘এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ’র নজরে আসার পর সংস্থাটি বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করেছে। এর সুফল পাচ্ছেন সব শ্রেণির মানুষ।
যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, মণিরামপুর ও বেশবপুরসহ সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একইভাবে বিশুদ্ধ ও আর্সেনিকমুক্ত পানির ব্যবস্থা করেছে সংস্থাটি। হাসপাতালগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও নানা অব্যবস্থাপনা থাকলেও বিশুদ্ধ পানির সংকট এখন আর নেই।