রায়হান সিদ্দিক: ঈদের বাজার ধরতে এবছর হরেক রকমের বড়দের পোশাকের পাশাপাশি ছোটদের পোশাক তুলেছেন যশোর শহরের কালেক্টরেট মার্কেটের ব্যবসায়ী ইফতেখার রহমান। আশা ছিলো গত দু’বছরের ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে এবছর ভালো ব্যবসা করবেন। রমজানের শুরুতে বাজারে ক্রেতাদের সমাগম ছিলো চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সময় যতো বাড়তে থাকে ক্রেতা সমাগম বাড়ার পরিবর্তে যেন কমছে। তিনি জানান, দু’বছর পর ধার দেনা করে দোকান সাজিয়েছি কিন্তু পরিস্থিতি খুবই খারাপ। রমজানের দু’ভাগ হতে চললেও জমেনি ঈদের বাজার। তাই ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত দুই বছর করোনার কারণে বিধিনিষেধ ছিল ঈদ বাজারে। তাই অনেক ক্ষতি হয়েছে। এবার করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় বিধিনিষেধের বাইরে রয়েছে সবকিছু। ভেবেছিলাম গত দুই বছরের ক্ষতি পুষিয়ে এবছর ভালো ব্যবসা হবে। কিন্তু সেগুড়ে বালি। এখনো জমেনি ঈদের বাজার। এবছর ঈদের বাজের মূলত ভাটা পড়েছে রেডিমেট পোশাকের দোকানগুলোতে।
তবে ঈদের বাজারে রেডিমেট পোশাকে ভাটা পরলেও গজ কাপড়ের দোকান জমজমাট। এসব দোকানের বেশির ভাগ ক্রেতা নারী। এখন থ্রিপিস, লং কামিজ, জিপসি থ্রিপিসসহ মেয়েদের পোশাকের নানা ধরনের কাপড় বিক্রি হচ্ছে।
শহরের লিচুতলার বাসিন্দা সুমাইয়া সুমি বড় বাজারের দোকান মর্ডান ক্লথ স্টোর থেকে নিজেরসহ পরিবারের চার সদস্যের জন্যে বিভিন্ন ডিজাইনের গজ কাপড় কেনেন। তিনি জানান, রেডিমেট পোশাক থেকে গজ কাপড়ে এবার তার আগ্রহ বেশি। কারণ গজ কাপড় দিয়ে মন মতোন পোশাক বানিয়ে নিতে পারবো।
কাজীপাড়ার বাসিন্দা আফরোজা আক্তার মিম বলেন, রমজানের শুরুতে বাচ্চাদের জন্য পোশাক কিনেছি। এখন বড়দের জন্য কেনা হচ্ছে। প্রথমে রেডিমেট দোকান ঘুরে নতুন কালেকশন না পেয়ে এখন গজ কাপড় কিনছি। দর্জিবাড়ি থেকে মন মতোন বানিয়ে নিবো।
বড় বাজারের ব্যবসায়ী আশা গার্মেন্টেসের সত্ত্বাধিকারী পারুল নাহার আশা বলেন, ব্যবসায় আগের গতি ফিরে না আসায় পুরোপুরি স্বস্তি পাচ্ছি না। আশা ছিলো দু’বছরের ক্ষতি এবার পুষিয়ে উঠতে পারবো। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে তাতে করে সম্ভাবনা কম।
বেবি কালেকশনের সত্ত্বাধিকারী সোহরাব হোসেন বলেন, প্রতি বছর ছোটদের পোশাকের দোকানগুলোতে বেশ ভিড় থাকে। কিন্তু এবছরের চিত্র ভিন্ন। যেখানে ২০১৯ সালেও দিনে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার ব্যবসা হয়েছে। সেখানে এবছর ২০ হাজার টাকার ব্যবসাও যেনো ঈদের চাঁদ। ভরসা বিশ রোজার পর যদি ক্রেতা সমাগম হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে যশোরের প্রতিটি মার্কেট আর শপিংমলগুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে সাজানো হয়েছে। তবে শহরের বড় বাজার, এইচ এম এম রোড, কালেক্টরেট মার্কেট, মুজিব সড়ক রোডের মার্কেটসহ কোনো শপিং মলেই ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়নি। ব্যবসায়ীরা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে রয়েছেন। ক্রেতারাও আসছেন কিন্তু কেনার চেয়ে ঘুরে দেখার প্রবণতা বেশি।
শহরের কালেক্টরেট মার্কেটের মেহেদি গার্মেন্টসের সত্ত্বাধিকারী ফিরোজ গাজী জানান, করোনার ভেতর যাও কিছুটা ব্যবসা হয়েছে। কিন্তু এবছর বিধিনিষেধ না থাকা সত্ত্বেও ঈদের আমেজ এখনো তৈরি হয়নি।
একই মার্কেটের আরিয়ান গার্মেন্টসের সত্ত্বাধিকারী মিঠু হাসান বলেন, ভেবেছিলাম এবছরের ঈদের বাজার বেশ গরম থাকবে সেই অনুযায়ী দোকান সাজিয়েছি কিন্তু এবছর অবস্থা আরও খারাপ।
অন্যদিকে দোকান মর্ডান ক্লথ স্টোরের মালিক বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, ‘ভারতীয় কাপড়ের প্রতি মেয়েদের আগ্রহ বেশি। দেশি গজ কাপড়ের প্রতি আগ্রহ কম। এখন থ্রিপিসের কাপড়ই বেশি বিক্রি হচ্ছে। বেচাবিক্রি সন্তোষজনক। ধারণা করছি ২৫ রোজা পর্যন্ত এই বিক্রি অব্যাহত থাকবে।
যশোর ক্লথ স্টোরের মালিক আজাহার বলেন, যশোর শহর ছাড়াও আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে ঈদ উপলক্ষে অনেকেই আমাদের দোকানে গজ কাপড় কিনতে আসছে। কাপড়ের দাম গতবারের মতোই।
কাপুড়িয়াপট্টির কাপড় ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক জানান, এ বছর বাজারে নারীদের কাছে বিভিন্ন ডিজাইনের সুতির কাপড়, কম্পিউটার কাজ করা ফ্যাশানেবল জর্জেট, নেট, সিল্ক ও সুতির থ্রিপিসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বাজারে বিদেশি কাপড়ের তুলনায় দেশি কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম।
রেডিমেট পোশাকের কদর কম থাকার কারণ জানতে চাইলে সিটিপ্লাজার ব্যবসায়ী মোমিনুল ইসলাম রাসেল জানান, ক্রেতারা প্রতি বছর নতুন কালেকশন চায়। কিন্তু দু’বছর করোনার কারণে ব্যবসা না থাকায় মোকামগুলোতে নতুন তেমন কোন কালেকশন নেই। সবাই পুরাতন যা ছিলো তা দিয়েই এবছর পার করতে চান। যার কারণে রেডিমেট থেকে এবছর গজ কাপড়ের চাহিদা অনেক বেশি।
অন্যদিকে মুজিব সড়কে অবস্থিত ব্যাপের সত্ত্বাধিকারী আজিম খান জানান, এবছর আশানুরূপ ব্যবসা না হওয়ার সম্ভবনা বেশি। কারণ নতুন প্রডাকশন নেই। আর দু’বছরের অভিজ্ঞতায় কোন ব্যবসায়ীয় আর রিস্ক নিতে চায় না।