গভীর রাতে নারীদের বাড়িতে হানা, কুপ্রস্তাব ও উত্ত্যক্তের অভিযোগ | টার্গেট বিধবা-স্বামী পরিত্যক্তা ও অসহায় নারীরা | ১০ বছর ধরে উৎপাত | ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে তাকে আটক করেছে পুলিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাত গভীর হলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত ঝিকরগাছার কলাগাছি গ্রামে। যে বাড়িতে পুরুষ সদস্য নেই, সেসব বাড়িই যেন ছিল তার টার্গেট। কখনো গভীর রাতে বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা, কখনো জানালা দিয়ে কুপ্রস্তাব, আবার কখনো নারীদের পথ আটকে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি—এমন নানা অভিযোগে দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিলেন আব্দুল বারিক ওরফে ‘বারিক লাল’।
বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, প্রতিবন্ধী ও অসহায় নারীদেরই বেশি উত্ত্যক্ত করতেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সুযোগ পেলে নারীদের জাপটে ধরা, গায়ে হাত দেওয়া, গভীর রাতে বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানোসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি ঘরের টিন কেটে পানি বা কাদাপানি ছিটানো এবং চালে ঢিল ছোড়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অবশেষে গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটার দিকে এক নারীর বাড়িতে ঢুকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে এলাকাবাসী তাকে আটক করেন। পরে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আব্দুল বারিককে আটক করে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
১০ বছরেও থামেনি উৎপাত
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৮-১০ বছর ধরে বারিক লালের বিরুদ্ধে নারীদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। একাধিকবার হাতেনাতে ধরা পড়ে স্থানীয়দের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন তিনি। কয়েক দফা স্থানীয়ভাবে বিচার বসিয়ে জরিমানার সিদ্ধান্তও হয়েছিল বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। কিন্তু কোনো কিছুতেই থামেনি তার কর্মকাণ্ড।
বরং সময়ের সঙ্গে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সম্প্রতি এক নারী ঝিকরগাছা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে তিনি জানান, গত কয়েক দিন ধরে বারিক তাকে উত্ত্যক্ত করছিলেন। ২৮ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটার দিকে বারিক তার বাড়িতে গিয়ে জানালা দিয়ে কুপ্রস্তাব দেন। এতে তিনি ভয়ে চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে বারিককে আটক করেন। পরে ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ তাকে নিয়ে যায়।
ওই নারীর অভিযোগ, বারিক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বয়সী নারীকে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছেন। নির্জন স্থানে নারীদের সামনে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পুরোনো অভিযোগেরও শেষ নেই
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বারিক লালের বিরুদ্ধে একাধিক পুরোনো অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক থেকে দেড় বছর আগে এক প্রতিবেশী নারীর বাড়ির টয়লেটে প্রতিদিন ঝালের গুঁড়া দিয়ে রাখতেন বারিক। ওই নারীর স্বামী কর্মসূত্রে ঢাকায় থাকতেন। বিষয়টি সন্দেহ হলে ওই নারীর ভাই বাড়িতে লুকিয়ে থেকে বারিককে ঢুকতে দেখে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। পরে তাকে মারধর করে স্থানীয়ভাবে বিচার বসানো ও জরিমানা করা হয় বলে দাবি স্থানীয়দের।
আরেক ঘটনায় এক স্বামী পরিত্যক্তা নারীকে জাপটে ধরার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গভীর রাতে বাড়িতে আসার কথা বলে ওই নারীকে দরজা খুলে রাখার জন্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন স্থানীয়রা। এক রাতে ওই নারীর বাড়ির সামনে বারিককে উত্ত্যক্ত করতে দেখে তার বাবা টর্চের আলো ফেললে তাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পান বলে দাবি করা হয়েছে। তখন বারিক ওই ব্যক্তির পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চান বলেও স্থানীয়দের ভাষ্য।
সিসি ক্যামেরাতেও ধরা পড়ে
সত্তরোর্ধ্ব এক বিধবা নারীও দীর্ঘদিন বারিকের উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পরে তার ছেলে বাড়িতে গোপনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেন।
স্থানীয়দের দাবি, ঈদুল আজহার দুই দিন আগে রাত আড়াইটার দিকে বারিক ওই বাড়িতে প্রবেশ করেন। সিসি ক্যামেরায় বিষয়টি ধরা পড়লে তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে বিচার হওয়ার কথা থাকলেও তিনি সেখানে উপস্থিত হননি বলে জানান স্থানীয়রা।
এ ছাড়া এক প্রবাসীর বাড়িতে গিয়ে ঘরের টিনে ছিদ্র করে সিরিঞ্জের মাধ্যমে তার স্ত্রী ও মেয়ের শরীরে কাদাপানি ছিটানোর অভিযোগও রয়েছে বারিকের বিরুদ্ধে।
‘রাত হলেই আতঙ্কের নাম বারিক’
বারিক আটক হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ময়না খাতুন বলেন, “বারিক নেশা করে সারা রাত বিভিন্ন মহিলাকে ডিস্টার্ব করত। ৮-১০ বছর ধরে সে এ কাজ করছে।”
রোকাব, সাথী, রেবেকা, হেবা, হালি ও মমতাজসহ কয়েকজন নারীও বারিকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের উত্ত্যক্তের অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, রাত হলেই নারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতো। স্থানীয়দের দাবি, এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক নারী তার উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলেও তারা জানান।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বারিক নিজের কলাক্ষেতে একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করে সেখানে নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। দিনের বড় একটি সময়ও তিনি সেখানে অবস্থান করতেন বলে স্থানীয়রা জানান।
প্রভাবশালীদের সুপারিশ, তবু ছাড়েনি পুলিশ
ঝিকরগাছা থানার সাব-ইন্সপেক্টর ও নাভারণ ইউনিয়ন বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, “২৮ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটার দিকে ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ কলাগাছি গ্রামে যায়। সেখান থেকে বারিককে আটক করা হয়।”
তিনি বলেন, পরদিন তাকে ছেড়ে দিতে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি সুপারিশ করেছিলেন। তবে পুলিশ কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে।
ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া হাসান বলেন, আব্দুল বারিকের বিরুদ্ধে আগেও এ ধরনের একাধিক অভিযোগ ছিল। তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, থানায় অভিযোগ করার পর একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে। এমনকি তার বাড়িতে আগুন দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেছেন। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও তার কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
