গত বুধবার জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিশুদের মাত্র ৩৪ শতাংশ পড়তে পারে। এই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাত্র ১৮ শতাংশের গুণতে পারার প্রাথমিক দক্ষতা রয়েছে। প্রতিবেদনে ইউনিসেফ বলেছে, বাংলাদেশে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং আবার ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্কুল বন্ধ থাকায় প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ শিশুর পড়তে ও গুণতে পারার প্রাথমিক দক্ষতার ঘাটতি উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। এই ঘাটতি মহামারির আগেও ছিল।
শিক্ষার মানের উন্নতির প্রথম শর্ত ভালো শিক্ষক। যেকোনো পর্যায়ের শিক্ষকতার চেয়ে প্রাথমিকে শিক্ষকতা কঠিন। স্পর্শকাতর ও কোমলমতি শিশুদের বুঝে শিক্ষা দিতে হয়। দক্ষ শিক্ষকের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীই দুর্বলতা নিয়ে শিক্ষাজীবনের প্রথম ধাপটি পার করছে। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান সেভাবে বাড়ছে না বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আবার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না পেলে শিক্ষকরা দক্ষ হয়ে উঠতে পারবেন না।
আমরা বিদেশের প্রাথমিক শিক্ষার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই প্রাথমিক শিক্ষায় যেসব দেশ সাফল্য অর্জন করেছে বা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, সেখানে শিক্ষকদের পেশায় আসার আগে পাঁচ বছরের তাত্ত্বিক শিক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক। অনেক দেশে প্রাথমিকের শিক্ষকদের মর্যাদা ডাক্তার ও আইনজীবীদের সমান। উচ্চ বেতন, পেশার স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদার কারণে সেখানে প্রাথমিকে শিক্ষকতার প্রতি মেধাবীরা আকৃষ্ট। যেমন ফিনল্যান্ডের সাড়ে তিন হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬২ হাজার শিক্ষকের সবাই স্নাতকোত্তর।
অথচ বাংলাদেশে দেখা যাবে এর বিপরীত চিত্র। এখানে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব সময় অবহেলিত। দেশের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন জরাজীর্ণ। কোথাও কোথাও মাঠে পাঠদান করতে হয়। শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সেগুলোর মানও সবখানে সমান নয়। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কারণ অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়েই মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব আছে। উপযুক্ত ভবন নেই, আসবাব বা শিক্ষা উপকরণ নেই বললেই চলে।
দেশে শিক্ষানীতির অনেক কিছুই এখনো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন কখনো অর্থবহ হবে না। ইউনিসেফ বলছে, আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি, শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের শেখার অবস্থা কী, তা মূল্যায়ন করা। তারা যা হারিয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় নিবিড় সহায়তা প্রদান এবং শিক্ষকরা যাতে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা উপকরণ পায়, তা নিশ্চিত করা। এগুলো করতে না পারলে অনেক বেশি ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে শিশুদের মন থেকে প্রতিযোগিতার ভয় দূর করতে হবে।