হরমুজ সংকটে ব্যারেল ১০৭ ডলার—বাড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়ের ঝুঁকি
কল্যাণ ডেস্ক
বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সকালের লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ ডলার ২১ সেন্ট বা ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ৮২ সেন্টে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডের দাম ৩ ডলার ১৭ সেন্ট বা ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ১০৩ ডলার ২২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো ঘিরে অনিশ্চয়তা যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতাও তত বাড়তে পারে।
সৌদির পাইপলাইন বন্ধ, সরবরাহে নতুন শঙ্কা
সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হুতিদের নতুন হামলার পর দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ড্রোন হামলার পর নিরাপত্তার কারণে পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। পাইপলাইনটি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কতদিন বন্ধ থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তেল রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানিয়েছে, পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ইয়ানবু বন্দরে থাকা মজুত দিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের রপ্তানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।
ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাজারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়লে সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে।
হরমুজ ও বাব আল-মানদেব ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
শুধু সৌদি আরব নয়, হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। হামলার পর একটি জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং নাবিকদের সরিয়ে নিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও।
ইরান জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় একজন নিহত ও চারজন নাবিক আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতিরা গত শুক্রবার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে বাব আল-মানদেব প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার চেষ্টা চলছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ সাম্প্রতিক সময়ে এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে।
ফলে হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরেই সরবরাহ ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
সপ্তাহেই দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ
সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে গত জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও দীর্ঘ হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের আলোচনার জন্য সোমবার ওমানে যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, সেটিও স্থগিত করা হয়েছে। ফলে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বড় চাপ
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। কারণ জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বাড়ে।
ঢাকা চেম্বারের হিসাবে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই হারে সারা বছর বাড়তি দামে তেল কিনতে হলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৯৬ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকায় উঠেছে। রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় সরকারের ঋণের চাপও বাড়ছে। এর মধ্যে জ্বালানি আমদানির ব্যয় আরও বেড়ে গেলে তা সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
বাড়বে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যয়
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প ও বাজারজাতকরণের খরচও বেড়ে যাবে।
একই সঙ্গে জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে। আমদানি করা জ্বালানি তেলের দাম বেশি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক বেশি থাকায় নতুন করে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বাড়তি তেল আমদানির সময়েই নতুন ধাক্কা
এদিকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়ানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাড়তি তেলের চালান আসতে শুরু করেছে এবং ২০ সেপ্টেম্বরের পর দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এমন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে বাড়ছে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে দাম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি আমদানি, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক কৌশল নেওয়া জরুরি।
