তালিকায় সাবেক উপাচার্য আবদুল মজিদের নামও
নিজস্ব প্রতিবেদক
গবেষণায় চুরি, তথ্য জালিয়াতি ও প্রকাশনা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রের তালিকায় রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মজিদের নাম। একই সঙ্গে গত দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত অন্তত ১১টি গবেষণাপত্রও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাময়িকী থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সম্প্রতি ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যাহার হওয়া ৩২৫টি গবেষণাপত্রের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। গবেষক, শিক্ষক ও একাডেমিক মহলে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
উপাচার্যের গবেষণাপত্রও প্রত্যাহার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মজিদ ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যবিপ্রবির চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে এর প্রায় আট মাস আগে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিন্দাউই তাঁর সহলেখক হিসেবে থাকা দুটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করে।
প্রত্যাহার হওয়া একটি গবেষণায় দেশে উৎপাদিত শজনে বীজের নির্যাসের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা হয়েছিল। অন্য গবেষণাটি ছিল সেলুলোজভিত্তিক ন্যানোকম্পোজিট ব্যবহার করে দূষণকারী উপাদান অপসারণ ও জৈব অণু সংরক্ষণের কার্যকারিতা নিয়ে।
তদন্তে উঠে আসে গুরুতর অনিয়ম
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিন্দাউইয়ের তদন্তে বলা হয়, গবেষণাগুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা ছাড়াই তথ্য ও ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষণার তথ্যের বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতারও কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়, গবেষণাপত্র দুটি তথাকথিত ‘পেপার মিল’-এর মাধ্যমে তৈরি বা সংগ্রহ করা হয়েছিল। অর্থের বিনিময়ে গবেষণাপত্র লিখে দেওয়া, বিক্রি করা বা প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেয়—এ ধরনের সংগঠিত চক্রকেই ‘পেপার মিল’ বলা হয়।
তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পিয়ার-রিভিউ প্রক্রিয়াতেও ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট লেখকদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তাদের দেওয়া জবাব সন্তোষজনক হয়নি বলে জানায় হিন্দাউই।
যবিপ্রবির ১১ গবেষণাপত্র প্রত্যাহার
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত যবিপ্রবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত ১০টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে ২০২৬ সালের মে মাসে আরও একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১টি।
যা বললেন আবদুল মজিদ
গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক আবদুল মজিদ বলেন, এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়নি। তিনি গবেষণায় মূলত ধারণাগত বা আইডিয়া প্রদানের পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
“দু-একটি গবেষণা প্রত্যাহারের কথা শুনেছিলাম। তবে যাঁদের বিরুদ্ধে এ ধরনের সমস্যা ছিল, তাঁদের গবেষণার জন্য পুরস্কার দেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সম্পৃক্ত করিনি।”
একাডেমিক সততা নিয়ে উদ্বেগ
গবেষণা অনিয়মে নাম এসেছে দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, এআইইউবি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগোর নিউরোসায়েন্স বিভাগের গবেষক নাদিম মাহমুদ বলেন, গবেষণায় চুরি, তথ্য জালিয়াতি ও নৈতিকতা লঙ্ঘন উন্নত বিশ্বে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের একাডেমিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশেও গবেষণার মান ও নৈতিকতা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
