প্যাকেট ডালের বদলে ময়লাযুক্ত খোলা ডাল, লাল চিনির বদলে সাদা চিনি ‘মান খারাপ হলেও নিতে হয়’
রুহুল আমিন
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাজারদরের চেয়ে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) স্মার্ট কার্ড কর্মসূচি। কিন্তু যশোরে সেই সহায়তাই এখন প্রশ্নের মুখে। কার্ডধারীদের অভিযোগ, ভর্তুকি মূল্যে পাওয়া পণ্যের বড় একটি অংশই নিম্নমানের। প্যাকেটজাত ডালের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে ময়লাযুক্ত খোলা ডাল, লাল চিনির বদলে সাদা চিনি এবং সোয়াবিন তেলের পরিবর্তে নিম্নমানের ‘সুপার’ তেল। কোথাও চালেও মিলছে ময়লা ও দুর্গন্ধ। এমনকি কাপড় পরিষ্কারের হুইল পাউডার প্যাকেট খোলার পরই গলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নিম্নমানের পণ্য নিয়ে আপত্তি জানালেও অনেক কার্ডধারীর সামনে কার্যত কোনো বিকল্প নেই। তাঁদের ভাষ্য, কোনো মাসে টিসিবির পণ্য না নিলে পরের মাসে বরাদ্দ থাকে না। ফলে পণ্যের মান খারাপ হলেও কার্ডের সুবিধা ধরে রাখতে বাধ্য হয়েই তা নিতে হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারের ভর্তুকি কার্যক্রমে এমন পরিস্থিতি শুধু পণ্যের মান নয়, পুরো সরবরাহব্যবস্থার নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোরের আট উপজেলা ও আট পৌরসভার ৭২টি ওয়ার্ডে প্রতি মাসের শেষ সপ্তাহে টিসিবির পণ্য বিতরণ করা হয়। জেলার ৯৩টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার কার্ডধারীরা স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে চাল, ডাল, তেল, চিনি, কাপড় পরিষ্কারের পাউডার ও সাবানসহ বিভিন্ন পণ্য বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে পান। জেলায় টিসিবির স্মার্ট কার্ডধারী উপকারভোগীর সংখ্যা দেড় লাখের বেশি।
কার্ডধারীদের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে পণ্যের মান নিয়ে সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। কোথাও চালের সঙ্গে ময়লা ও দুর্গন্ধ, কোথাও ডালে ময়লা; আবার নির্ধারিত প্যাকেটজাত ডালের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে খোলা ডাল। তেলের মান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। চিনি নিয়ে রয়েছে ভিন্ন অভিযোগ—কার্ডে বা প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থায় যে ধরনের চিনি দেওয়ার কথা, তার পরিবর্তে সরবরাহ করা হচ্ছে সাদা চিনি।
যশোর শহরের উপশহর পার্ক এলাকার ৭০ বছরের বেশি বয়সী মোহাম্মদ হানিফের জীবনেই এ সংকটের নির্মম বাস্তবতা স্পষ্ট। সন্তান না থাকায় বয়স হলেও দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজও করতে পারেন না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পাওয়া টিসিবির কার্ডই তাঁর পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার অন্যতম ভরসা।
হানিফ বলেন, “কোনো মাসে পণ্য না নিলে পরের মাসে বরাদ্দ আসে না। তাই পণ্যের মান খারাপ হলেও নিতে হয়।”
উপশহর সি-ব্লকের বাসিন্দা এম এন আশরাফ শুভ বলেন, গত মাসে পাওয়া হুইল পাউডারের প্যাকেট খোলার পরই সেটি গলে নষ্ট হয়ে যায়। কাপড় পরিষ্কারের সাবানেও পর্যাপ্ত ফেনা হয় না বলে অভিযোগ তাঁর।
উপশহর পুকুরপাড় বস্তির বাসিন্দা আব্দুল গণির অভিযোগ, সোয়াবিন তেলের পরিবর্তে নিম্নমানের ‘সুপার’ তেল দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা গরিব মানুষ। বাজার থেকে একই পণ্য কিনতে গেলে প্রায় ২৫০ টাকা বেশি লাগে। তাই মান খারাপ হলেও নিতে হচ্ছে।”
শিক্ষাবোর্ডপাড়ার বাসিন্দা তানজিলা বেগম বলেন, টিসিবির তেলের মান নিয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে এবং শীতের সময় তেল জমে যায়। একই এলাকার জাহানারা বেগমের অভিযোগ, টিসিবির চাল ও ডালে ময়লা থাকে। বাড়িতে এনে পরিষ্কার করার পর তা রান্নার উপযোগী করতে হয়।
তবে টিসিবির পণ্য বিতরণের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, পণ্যের মান নির্ধারণ কিংবা নিম্নমানের পণ্য পরিবর্তনের ক্ষমতা তাঁদের নেই। টিসিবি ডিলার আতিকুর রহমান আতিক বলেন, যশোর অঞ্চলের টিসিবির পণ্য ঝিনাইদহের প্রধান ডিপো থেকে সরবরাহ করা হয়। সেখান থেকে উপজেলা পরিষদ হয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিতরণ করা হয়। নিম্নমানের পণ্য এলে তা পরিবর্তন বা ফেরত দেওয়ার সুযোগ তাঁদের নেই।
উপশহর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শহীদ ইকবাল বলেন, টিসিবির পণ্য মূল ডিপো থেকে সরাসরি উপজেলায় আসে। উপজেলা থেকে বণ্টনের পর ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো হয়। ফলে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা সীমিত।
ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক নাসির উদ্দিন বলেন, টিসিবির পণ্যের মান নিয়ে অভিযোগ তিনি শুনেছেন। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহারিয়ার হক বলেন, অনেকে টিসিবির পণ্য নিম্নমানের বলে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে সত্যিই নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকলে টিসিবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভর্তুকির পণ্য নিয়ে প্রশ্ন
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য রাষ্ট্রের ভর্তুকি মানে শুধু কম দামে পণ্য দেওয়া নয়—নিশ্চিত করতে হয় সেই পণ্য মানসম্মত, নিরাপদ ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কি না। যশোরের দেড় লাখের বেশি কার্ডধারীর অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সরবরাহের উৎস থেকে শুরু করে ডিপো, পরিবহন ও বিতরণ—পুরো ব্যবস্থায় কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি জরুরি।
কারণ, বাজারদরের চেয়ে কম দামে পণ্য পাওয়ার সুযোগকে যদি নিম্নমানের পণ্য গ্রহণের বাধ্যবাধকতায় পরিণত করা হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেই মানুষগুলোই, যাঁদের জন্য সরকারের এই কর্মসূচি।
