গ্রেপ্তার ৭, স্বীকারোক্তি ৩ জনের; ১৫ লাখ টাকার ‘কিলিং মিশন’, পলাতক আরও কয়েকজন
লাবুয়াল হক রিপন
যশোরের চাঞ্চল্যকর বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন হত্যা মামলার তদন্ত শুরুর নয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। এরই মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামিসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অর্থ লেনদেন এবং হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
তদন্তে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও আরও কয়েকজন পলাতক থাকায় তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, পলাতকদের গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যার পুরো রহস্য আরও স্পষ্ট হবে।
১৫ লাখ টাকার ‘কিলিং মিশন’
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে হত্যার জন্য ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। ঘটনার দিন হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে কথিত মূল শুটার ত্রিদিব চক্রবর্তী ওরফে মিশুককে এক লাখ টাকা ও একটি পিস্তল দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বাকি চার লাখ টাকা হত্যাকাণ্ডের পর এবং অবশিষ্ট ১০ লাখ টাকা পরে পরিশোধের কথা ছিল।
পুলিশের দাবি, আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
তিন মোটরসাইকেলে অনুসরণ, চলন্ত অবস্থায় গুলি
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আলমগীর হোসেনকে হত্যার পরিকল্পনায় ১০ থেকে ১২ জন অংশ নিয়েছিল। তাঁরা তিনটি মোটরসাইকেলে করে আলমগীরকে অনুসরণ করেন।
গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টার দিকে আলমগীর মোটরসাইকেল চালিয়ে শংকরপুর বটতলা হয়ে ইসহাক সড়কের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেল তাঁকে অনুসরণ করতে থাকে। ইসহাক সড়কের একটি দোকানের সামনে তিনি কিছু সময়ের জন্য থামলে হামলাকারীরাও সেখানে অবস্থান নেয়।
পরে একটি মোটরসাইকেল সামনে চলে যায়। আলমগীর সাবেক কাউন্সিলর নয়নের অফিসের কাছাকাছি পৌঁছালে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাঁকে গুলি করেন ত্রিদিব চক্রবর্তী ওরফে মিশুক বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গুলির পর হামলাকারীদের কয়েকজন দুটি মোটরসাইকেলে করে গোলপাতা মসজিদের দিকে পালিয়ে যায়। অন্য মোটরসাইকেলটি ঘুরিয়ে বটতলার দিকে চলে যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এজাহারে দুই, তদন্তে আসামি সাত
আলমগীর হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী শামীমা খাতুন বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। এজাহারে নিহতের মেয়ের স্বামী পরশ ও তাঁর বন্ধু সাগরকে আসামি করা হয়।
পরে তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানায়। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন—আলমগীরের জামাতা পরশ, তাঁর সহযোগী সাগর, কথিত মূল শুটার ত্রিদিব চক্রবর্তী ওরফে মিশুক, শাহীন কাজী, মনিরুল ইসলাম, আলমগীরের ভাইপো রাকিব এবং অখিল ইসলাম প্রিন্স।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের পরপরই পরশ ও সাগরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ত্রিদিবকে আটক করা হয়। ত্রিদিবের তথ্যের সূত্র ধরে রায়পাড়া তুলোতলা এলাকার শাহীন কাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। শাহীন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁর জবানবন্দিতে মনিরুল ইসলামের নাম উঠে আসে। পরে মনিরুলসহ আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিন আসামির স্বীকারোক্তি
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলমগীর হত্যার পরিকল্পনায় তাঁর জামাতা পরশের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা ও অস্ত্রসহ ১৭টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আদালতে হাজির করা হলে তিনি আলমগীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি। অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নয় মাসেও শেষ হয়নি তদন্ত
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক অলক কুমার দে বলেন, ঘটনার পর তদন্তে বেশ কিছু নতুন নাম উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন।
তিনি বলেন, পলাতক আসামিরা ঘটনার পর এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। তবে তদন্তে উঠে আসা আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এ কারণে চার্জশিট দাখিলে সময় লাগছে।
পরিবারের প্রশ্ন—আর কত অপেক্ষা?
হত্যাকাণ্ডের নয় মাস পরও অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়ায় নিহত আলমগীর হোসেনের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে মামলার বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সব তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
আলমগীর হোসেন শংকরপুরের ইসহাক সড়কের ইন্তাজ আলী চৌধুরীর ছেলে। তিনি যশোর নগর বিএনপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি ‘গ্রিন প্রপার্টিজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি জমি কেনাবেচার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। হত্যার নেপথ্যের কারণ নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়।
