যশোরে আমন চাষে বাড়ছে কৃষকের খরচ, টিএসপি মিলছে না নির্ধারিত দামে
তবিবর রহমান
চলতি আমন মৌসুমে যশোরে সারের বরাদ্দ ও মজুত পর্যাপ্ত থাকার দাবি করছে কৃষি বিভাগ। তবে মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না। বিশেষ করে টিএসপি সার কিনতে একাধিক দোকান ঘুরতে হচ্ছে তাঁদের। কোথাও আবার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। এতে আমন চাষের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আগস্ট মাসে ১০ হাজার ৭০৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৩ হাজার ৮২ মেট্রিক টন টিএসপি, ২ হাজার ৭৮২ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ২ হাজার ৬৩১ মেট্রিক টন এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
২৫ আগস্ট পর্যন্ত এর মধ্যে ইউরিয়া ৮ হাজার ৫৩৪ মেট্রিক টন, টিএসপি ২ হাজার ৮১০ মেট্রিক টন, ডিএপি ২ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২ হাজার ২৩১ মেট্রিক টন উত্তোলন করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, কৃষক পর্যায়ে প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকায় বিক্রি করার কথা।
কিন্তু যশোরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত দামে মিলছে না সার। বিশেষ করে টিএসপির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের মূল্য ব্যবধান। তিউনিসিয়ার টিএসপির প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। মিসরের টিএসপি ১ হাজার ৭০০ টাকা এবং মরক্কোর টিএসপি ১ হাজার ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া জর্ডানের ডিএপি ১ হাজার ৬৫০ টাকা, চীনের ডিএপি ১ হাজার ৫৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
‘দুই বস্তা চাইলে এক বস্তা পাই’
চৌগাছা উপজেলার আন্দুলিয়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, “সারের সংকট আছে। দুই বস্তা চাইলে এক বস্তা পাওয়া যাচ্ছে। এর ওপর নির্ধারিত দামেও সার পাওয়া যাচ্ছে না।” তাঁর অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকার ইউরিয়া তাঁকে কিনতে হয়েছে ১ হাজার ৭৫০ টাকায়।
ঝিকরগাছা উপজেলার নারাঙ্গালী গ্রামের কৃষক মো. আবদুল আলিম এবার চার বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। তিনি বলেন, অনেক দোকান ঘুরে খোলাবাজার থেকে প্রতি কেজি ৫২ টাকা দরে ২০ কেজি টিএসপি কিনে জমিতে দিতে হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে দুই বস্তা ইউরিয়াও কিনেছেন তিনি।
কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপি সারের সংকটকে কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছেন। ফলে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ায় কৃষকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
অতিরিক্ত দামে বিক্রির প্রমাণ, জরিমানা
সার অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে প্রশাসনের অভিযানে। গত ২ আগস্ট অভয়নগর উপজেলার মরিচা ও শুভরাড়া বালুরঘাট বাজারে অভিযান চালিয়ে দুই সার পরিবেশককে মোট ১০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশীষ কুমার বসুর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে মেসার্স মাসুদ-মামুন ট্রেডার্সের মালিক মাসুদ মোল্লাকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা দামের এক বস্তা টিএসপি ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রির দায়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অভিযোগে মেসার্স ভাই ভাই কৃষি স্টোরের মালিক রিয়াজ উদ্দীনকে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
এরপর গতকাল মঙ্গলবার চৌগাছা উপজেলার কুটিপাড়া মোড় এলাকায় আলমসাধুতে করে ঝিকরগাছার দিকে নেওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন ৩৭ বস্তা সার আটক করেন। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সার পরিবহনের ক্রয়চালানসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চান। প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এসি ল্যান্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত সারগুলো জব্দ করেন।
গুদামে মজুত, তবু মাঠে সংকট কেন?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, “জেলায় কোনো সার সংকট নেই। কিছু ডিলার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন।”
তিনি জানান, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত জেলার গুদামগুলোতে ৩ হাজার ৭৩৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ১ হাজার ১৪৮ মেট্রিক টন টিএসপি, ১ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১ হাজার ৪১৩ মেট্রিক টন এমওপি সার মজুত রয়েছে।
যশোর সদরের বাহাদুরপুর বাফার গুদামের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) আক্তারুল ইসলাম জানান, তাঁর কার্যালয় থেকে যশোর, নড়াইল ও মাগুরায় বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সরবরাহ করা হয়। মঙ্গলবার পর্যন্ত ওই গুদামে ১৩ হাজার ৮৪৬ মেট্রিক টন ইউরিয়া মজুত রয়েছে।
প্রশ্নের মুখে সরবরাহব্যবস্থা
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যশোরে সারের বরাদ্দ ও মজুত পর্যাপ্ত। কৃষি বিভাগও বলছে, জেলায় কোনো সার সংকট নেই। অথচ কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না; বিশেষ করে টিএসপি কিনতে গিয়ে তাঁদের অতিরিক্ত দাম গুনতে হচ্ছে।
প্রশাসনের অভিযানে আবার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণও মিলেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কৃষকের কাছে তা নির্ধারিত দামে পৌঁছাচ্ছে না কেন?
কৃষকদের অভিযোগ, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, ডিলারদের অনিয়ম এবং বাজার তদারকির ঘাটতির সুযোগেই তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম সংকট। আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়তে পারে ধানের উৎপাদন ও বাজারদরেও।
তাই শুধু গুদামে সার মজুতের হিসাব নয়, সার কোথায় যাচ্ছে, কার মাধ্যমে যাচ্ছে এবং কৃষক শেষ পর্যন্ত কত দামে তা কিনছেন—সেই পুরো সরবরাহব্যবস্থা কঠোরভাবে তদারকি করার দাবি উঠেছে।
