নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রেমের টানে গড়ে উঠেছিল নতুন সংসার। মাত্র কয়েক মাস আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন আত্মীয় সম্পর্কের দুই তরুণ-তরুণী। পরিবারও চেয়েছিল তাদের সুখী জীবন নিশ্চিত করতে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে। যশোর শহরের শেখহাটি তামালতলা এলাকায় মাদকের টাকার জেরে সৃষ্ট পারিবারিক কলহে স্বামী সুজনের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন তার স্ত্রী ছামিনা আক্তার (২০)। হত্যার পর নিজের শরীরেও ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় যশোর জেনারেল হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে পুলিশি পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোমবার (৮ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে শেখহাটি তামালতলা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত ছামিনা আক্তার যশোর সদর উপজেলার তরফ নওয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। অপরদিকে সুজনের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার গয়হাটা ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামে। বিয়ের পর তারা যশোর শহরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
পুলিশ, হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের পর প্রায় চার আগে তারা বিয়ে করেন। তবে বিয়ের পর ছামিনা জানতে পারেন, তার স্বামী মাদকাসক্ত। নেশার টাকার জন্য প্রায়ই সংসারে অশান্তি লেগে থাকত। স্বজনদের অভিযোগ, সুজন নিয়মিত মাদকের জন্য টাকা চাইতেন এবং টাকা না পেলে স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন।
ঘটনার দিন ভোরে মাদক কেনার টাকা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে সুজন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘরে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে ছামিনার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় ছামিনার চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্ত্রীকে হত্যার পর সুজন নিজের বুক ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরি দিয়ে আঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে স্বজন ও স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে একই হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতের মামা মোস্তাফিজুর রহমান পিয়াস জানান, সুজন আগে বিদেশে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের উদ্যোগে তাকে পুনরায় বিদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। সোমবারই মালয়েশিয়া যাওয়ার বিমানের টিকিট কাটার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ঘটে যায় এই মর্মান্তিক ঘটনা। তিনি দাবি করেন, মাদকাসক্তির কারণেই সুজনের আচরণ ক্রমেই হিংস্র হয়ে উঠেছিল।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. শাকিরুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে আনার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ছামিনার মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে সুজনের শরীরেও একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুজনের ওপর হামলার চেষ্টা করেন নিহতের কয়েকজন স্বজন। এতে হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সুজনের বাবা-মাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল জানান, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মাদকাসক্তি ও পারিবারিক কলহের বিষয়টি সামনে এসেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কাজ করছে।
