নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাওলানা শাহ আবদুল করিম সড়কের জেবির মোড় থেকে মুন্সিবাড়ি পর্যন্ত শতবর্ষেরও বেশি পুরোনো সরকারি সড়কের জায়গা দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছে কবির আলম ও খায়েরুল আলম চক্র। সড়কের জায়গায় কোথাও তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও আবার জমি বিক্রি করে সরকারি সড়কের জায়গাকে মূল জমির অংশ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
দখলের কারণে প্রায় ২২ থেকে ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কটি কোথাও কোথাও মাত্র ৭ থেকে ৯ ফুটে সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে ছোট যানবাহন চলাচল করলে পথচারীর হাঁটার সুযোগ থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি দখলমুক্ত না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার সার্ভেয়ার সম্প্রতি সড়কের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ স্থাপনাগুলোতে লাল সাংকেতিক চিহ্ন দিলেও এরপর আর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দখলদাররা অনেক ক্ষেত্রে সেই চিহ্নও মুছে দিয়ে আগের মতো স্থাপনা ও অন্যান্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেবির মোড় থেকে মুন্সিবাড়ি পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিনের পুরোনো সড়ক হিসেবে পরিচিত। ১৯২৬ সালের সিএস এবং ১৯৬২ সালের এসএ রেকর্ডেও সড়কটি পৌরসভার সরকারি রাস্তা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। ওই দুই রেকর্ড অনুযায়ী সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০৫ থেকে ২৩৫ ফুট এবং প্রস্থ ২২ থেকে ১৮ ফুট। তবে বর্তমানে সড়কের প্রস্থের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত জায়গা দখল হয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা মৃত আবদুর রাজ্জাকের ছেলে কবির আলম ও খায়েরুল আলমের নেতৃত্বে একটি চক্র সড়কের জায়গা দখল করেছে। কবির আলম সড়কের প্রবেশমুখের প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা দখল করে তিনতলা একটি ভবন নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ। পরে নিজের মূল জমির একটি অংশ চিকিৎসক আফসার আলীর কাছে বিক্রি করে সড়কের জায়গাও তার দখলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আফসার আলীও ওই জায়গা নিজের দখলে রাখার চেষ্টা করছেন। সেখানে প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি ভবন নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদনেরও চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি পৌরসভার সার্ভেয়ারের মাধ্যমে সড়কের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। দখল করা জায়গায় নির্মিত অবৈধ স্থাপনায় লাল সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও জানানো হয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদ অভিযান না হওয়ায় দখলদাররা বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী নাজমুল আরেফিন বলেন, ‘জেবির মোড় থেকে মুন্সিবাড়ি সড়কটির প্রস্থ একসময় ২২ থেকে ১৮ ফুট ছিল। এখন কোথাও ৯ ফুটের বেশি পাওয়া যায় না। পৌরসভার সার্ভের পর সড়কের সীমানা স্পষ্ট হয়েছে। অবৈধ স্থাপনায় লাল চিহ্নও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদ না হওয়ায় সড়কটি তার জায়গা ফিরে পাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে তাঁর বাড়িতে আগুন লাগলেও সড়ক সংকীর্ণ থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি বাড়ির কাছে পৌঁছাতে পারেনি। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বড় অ্যাম্বুলেন্সও বাড়ির ভেতর পর্যন্ত যেতে পারে না।’
আরেক বাসিন্দা রাজীব রায়হান বলেন, তাঁর স্ত্রী অসুস্থ। হঠাৎ কোনো সমস্যা হলে অ্যাম্বুলেন্স বাড়ির কাছে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে তাঁকে সবসময় চিন্তায় থাকতে হয়। প্রয়োজনে রোগীকে জেবির মোড় পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে হবে। তাঁর মতে, পৌরসভা উচ্ছেদ অভিযান চালালে দ্রুত সমস্যার সমাধান সম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দা আতিয়ার রহমান বলেন, ছোটবেলায় তিনি সড়কটি বেশ প্রশস্ত দেখেছেন। তাঁর দাবি, কবির আলম ও খায়েরুল আলমের দখলের কারণেই সড়কটি সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে সড়কটি অনেকটা গলিতে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসীর স্বার্থে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘বিষয়টি আমার ভালোভাবে জানা নেই। তবে কেউ সড়কের জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করলে তাঁর বিরুদ্ধে অবশ্যই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন বলেন, ‘জেবির মোড় থেকে মুন্সিবাড়ি পর্যন্ত সড়কের প্রায় ৮০ শতাংশ জায়গা দখল হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে পৌরসভার সার্ভেয়ারের মাধ্যমে সড়কের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। পৌরসভার পক্ষ থেকে অবৈধ স্থাপনায় লাল সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে মার্ক করা হয়েছে। এই মুহূর্তে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরীফ হাসান বলেন, ‘জেবির মোড় থেকে মুন্সিবাড়ি পর্যন্ত সড়কটির আপাতত সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে সড়কের জায়গা দখলমুক্ত করা হবে।’
তবে যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে প্রকৃত ঘটনা আমার জানা নেই। তবে পৌরসভার জায়গা বা সরকারি রাস্তা দখল করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ দখল করে ভবন বা প্রাচীর নির্মাণ করলে তা উচ্ছেদ করা হবে।’
সর্বশেষ
- যশোরে আওয়ামী লীগের ব্যানারে বিক্ষোভের অভিযোগে মামলা, আসামি ১১৩
- সরকারি রাস্তা ছিল ২২ ফুট, দখলে এখন ৭ ফুট—নেপথ্যে কবির-খায়েরুল চক্র!
- প্রেসক্লাব যশোরের আহ্বায়ক পদ থেকে একরাম-উদ-দ্দৌলার পদত্যাগ
- শরীরে, গাড়িতে, পকেটে স্বর্ণ যাচ্ছে সীমান্তে
- ঝিনাইদহে কয়েক ঘণ্টায় সড়ক, বিদ্যুৎ ও রেল দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীসহ ৫ জনের মৃত্যু
- গুদামে সার, মাঠে সংকট
- ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাটে মাছের মৃত্যু’—তদন্তে মিলল না দাবির সত্যতা
- বাসে গাঁজা পাচার, গ্যারেজে লুকিয়ে মজুত—যশোরে গ্রেপ্তার ৫
