কল্যাণ ডেস্ক
পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ। সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দানে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো মুসল্লি। মিনার তাঁবুনগরী থেকে ফজরের নামাজের পর থেকেই দলে দলে হাজিরা পৌঁছাতে থাকেন আরাফাতে। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে—
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক…”
তালবিয়ার এই সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে বিদায় হজের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র আরাফাতের ময়দান। যার অর্থ—“হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। তোমার কোনো শরিক নেই। সব প্রশংসা, নেয়ামত ও রাজত্ব শুধু তোমারই।”
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজিরা সেখানে অবস্থান করবেন, হজের খুতবা শুনবেন, আল্লাহর দরবারে কান্নাভেজা দোয়ায় নিজেদের সমর্পণ করবেন এবং জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন।
এ বছর হজের খুতবা প্রদান করছেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। মসজিদে নামিরাহ থেকে দেওয়া এই খুতবা বাংলাসহ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি ভাষায় সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে।
তীব্র গরমেও অবিচল ইবাদতে হাজিরা
এবারের হজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তীব্র গরমের মধ্যে। সৌদি আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, মক্কার তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এ কারণে হাজিদের ছাতা ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি পান ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্বেগের মধ্যেও এবারের হজে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের ১৫ লাখের বেশি মুসলমান। বাংলাদেশ থেকে হজ পালনে গেছেন ৭৯ হাজার ১৬৪ জন।
আরাফাতের ময়দান: রহমত ও ক্ষমার স্থান
মক্কা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আরাফাতের ময়দান ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রায় দুই মাইল দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের এই বিশাল সমতল ভূমির তিন দিক পাহাড়বেষ্টিত। এখানেই রয়েছে জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়, যেখানে দাঁড়িয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
আরাফাতের প্রান্তে অবস্থিত মসজিদে নামিরাহও হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বিশাল এই মসজিদে রয়েছে ছয়টি মিনার, ৬৪টি গম্বুজ ও ১০টি প্রধান দরজা। এখানেই হাজিরা জোহর ও আসরের নামাজ এক আজান ও দুই ইকামতে আদায় করেন।
মাগরিবের পর মুজদালিফায় যাত্রা
সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত ত্যাগ করে মুজদালিফার পথে রওনা হবেন। সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন করবেন এবং শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের জন্য কংকর সংগ্রহ করবেন।
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে যাচ্ছিলেন, তখন শয়তান তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। সেই স্মৃতিতেই মিনার জামারায় শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা
১০ জিলহজ হাজিরা মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করবেন। এরপর পশু কোরবানি, মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা এবং কাবা শরিফ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ায় সাঈ সম্পন্ন করবেন।
পরবর্তী দুই বা তিন দিন মিনায় অবস্থান করে ছোট, মধ্যম ও বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন তারা। সবশেষে বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে শেষ হবে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা।
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ পালন ফরজ। ত্যাগ, ধৈর্য, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের অনন্য শিক্ষা বহন করে এই মহান ইবাদত।
