নববর্ষের নতুন আলোয় লেখা হবে গর্বিত ইতিহাস
আব্দুর রউফ
যশোর পৌর উদ্যানে বর্ষবরণের ৫০ বছরের মাইলফলক ছুঁতে চলেছে উদীচী। এবার নববর্ষে যখন সূর্য উদিত হবে তখন আয়োজনের অর্ধশতকের আলোয় আলোকিত হবে পৌরপার্কের ছায়াঘেরা সবুজ চত্বরটি। আয়োজনের সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে সংগঠনটির গর্বিতকর্মীদের চোখেমুখে এখন এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সাল থেকে নববর্ষের উৎসব রাঙাচ্ছে যশোর উদীচী। সেসময় আমিন হোটেলের খোলা জায়গায় ছোট পরিসরে অনুষ্ঠান হতো। এরপর ১৯৭৬ সাল থেকে পৌরপার্কে বর্ষবরণ শুরু হয়। সেই যাত্রা এবার সুবর্ণজয়ন্তী ছুঁয়ে যাবে।
ছায়াঘেরা সবুজ এই প্রাঙ্গণ শুধু একটি অনুষ্ঠানস্থল নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতির উপাখ্যান। এখানে বড় হয়েছে অনেকের শৈশব, গড়ে উঠেছে সংস্কৃতিমনা মানুষের স্বপ্ন। নববর্ষের প্রভাতে যখন সূর্যের প্রথম আলো পড়ে উদ্যানের ঘাসে, তখনই শুরু হয় এক অন্যরকম আবহ গানে, কবিতায়, আবৃত্তিতে আর মুখরিত মানুষের পদচারণায় ভরে ওঠে চারপাশ।
গ্রামের কৃষক থেকে শহরের শিক্ষক, শ্রমজীবী থেকে শিক্ষার্থী সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসাথে মিশে যায় এই উৎসবে। কারো হাতে রঙিন মুখোশ, কারো হাতে একতারা, কেউবা আবার শুধু পরিবারের হাত ধরে হেঁটে আসেন এই আনন্দ ভাগ করে নিতে।
এই ৫০ বছরের যাত্রা সহজ ছিল না। নানা প্রতিকূলতা, সময়ের পরিবর্তন, আর্থিক সংকট সবকিছু পেরিয়ে টিকে আছে এই আয়োজন, মানুষের ভালোবাসায়। উদীচীর কর্মীরা তাদের সীমিত সামর্থ্য নিয়েও প্রতি বছর চেষ্টা করেছেন যেন ঐতিহ্যের এই শিখা নিভে না যায়।
এবারের আয়োজন তাই শুধু একটি উৎসব নয় এটি স্মৃতির পুনর্মিলন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এবং নতুন প্রজন্মের হাতে সংস্কৃতির উত্তরাধিকার তুলে দেওয়ার এক প্রতিশ্রুতি। হয়তো সেই পুরনো মুখগুলো আর আগের মতো নেই, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া পথ ধরে নতুনরা এগিয়ে যাচ্ছে।
পহেলা বৈশাখের সেই সকাল আবারও সাক্ষী হবে মানুষের ভালোবাসা, সংস্কৃতির টান আর একসাথে বাঁচার অদম্য ইচ্ছার। পৌর উদ্যানে আয়োজনের অর্ধশত বছর ঘিরে নববর্ষে যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এবার বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা সাজিয়েছে।
যশোর পৌর পার্কে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ভোর ৬টা ৩১ মিনিটে তাদের প্রভাতী অনুষ্ঠান শুরু করবে। অনুষ্ঠানমালার শুরুতে রাগ ভৈরবী থেকে শুরু চর্চাপাদ ঢাকের শব্দের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে দেশাত্মবোধক গান শিশুদের নাটিকা, রবীন্দ্র সংগীত নজরুল সংগীত, দলীয় নৃত্য একক নৃত্য দেশের আধুনিক গান এবং যাত্রাপালা। সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত চলবে প্রভাতী অনুষ্ঠানমালা চলবে। বিকালে আবার শুরু হবে অনুষ্ঠান। এর আগের দিন বিকালে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হবে পৌরপার্কে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, বিকালে দেশত্মবোধক গান, লোকসংগীত ভাওয়াইয়া গান, মুর্শিদি জারি-সারিসহ নানা রকম অনুষ্ঠানমালা দিয়ে তাদের বৈশাখের আয়োজন শেষ করবে।
উল্লেখ্য, যশোর উদীচী ঢাকার বাইরে প্রথম শাখা সংগঠন যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৯ সালে। প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর ১৯৭২ সাল থেকে উদীচী যশোরের আয়োজনে শুরু হয় বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ উদযাপন। তৎকালীন কার্যালয় যশোর আমীন হোটেলে ঘরোয়া পরিবেশে এ অনুষ্ঠান হয়। পরের বছর নেতাজী সুভাষ চন্দ্র রোডস্থ ক্যালট্যাক্সের সামনে উন্মুক্তস্থানে হয় বর্ষবরণানুষ্ঠান।
এরপর ১৯৭৪ সালের নববর্ষ আয়োজনের প্রস্তুতির সময় তৎকালীন উপদেষ্টা ডাক্তার কাজী রবিউল হক প্রস্তাবে পৌর উদ্যানে প্রকৃতির মাঝে এ অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুর সেই অনুষ্ঠান হয়েছিল দুই পুকুরের মাঝে সেতুর উপর। পরের বছর হয় পৌর উদ্যানে অবস্থিত ঝর্ণার পাশে। এখানে কয়েক বছর অনুষ্ঠান হওয়ার পর বর্তমান মঞ্চের উত্তর দিকে তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান খালেদুর রহমান টিটো অনুষ্ঠান করার জন্য মাটির ঢিবি তৈরি করে দেন।
এ ঢিবির উপর শুরু হয় বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। পরবর্তীতে ২০০১ সাল থেকে তৎকালীন পৌর মেয়র এসএস কামরুজ্জামান চুন্নু’র তত্ত্বাবধানে করে দেওয়া বর্তমানের স্থায়ী মঞ্চে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। এভাবেই এ উদ্যানে নববর্ষ উৎসব আয়োজনে এবার ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে।
সাজ্জাদুর রহমান খান নববর্ষ উৎসব সার্বজনীন করার লক্ষ্যে বলেন, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য তার সংস্কৃতি। আর এ সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ পেয়েছে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে। নববর্ষ বর্তমানে অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যে উৎসবে সকল জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান ভাবে অংশ নেয়। আর এ উৎসব আয়োজনে যশোর পথিকৃতের ভূমিকা পালন করছে।
৪৯ বছর আগে পৌর উদ্যানে বর্ষবরণের যে যাত্রা শুরু করেছিল তা আজ শ্রেষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক উৎসবে রূপ নিয়েছে। যশোরের এই সার্বজনীন উৎসব আয়োজনের শুরুটা উদীচীর দ্বারা হলেও সমস্ত যশোরের মানুষ যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস নিয়ে এ উৎসবকে গ্রহণ করেছে এটা উদীচীর বড় পাওয়া। তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার এ উৎসবে আরও ব্যাপক গণমানুষের অংশগ্রহণসহ শহরের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ুক প্রত্যাশা করেন এবং সকলকে আগাম বৈশাখী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
